ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

সিন্ডিকেটে জিম্মি কৃষক

ছামিউল ইসলাম আরিফ, হিলি (দিনাজপুর)
প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০৩:৩১ এএম

দিনাজপুরের হিলি সরকারি খাদ্যগুদামে চলতি বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের প্রভাবের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কৃষক তালিকায় নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর ও মোবাইল নম্বরে চরম অসঙ্গতি, প্রকৃত কৃষকদের ধান জমা দিতে না পারা এবং একই মোবাইল নম্বর একাধিক কৃষকের নামে ব্যবহারের চাঞ্চল্যকর ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে হিলি এলএসডি খাদ্যগুদামের মাধ্যমে ২৬৬ জন কৃষকের কাছ থেকে মোট ৫৩২ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ধানের মূল্য ছিল এক হাজার ৪৪০ টাকা। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উদ্বেগজনক চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত কৃষকদের একটি বড় অংশ সরকারি এই খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন। এর পরিবর্তে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো কৃষক তালিকা নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের মতো করে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তালিকায় অনেক কৃষক কেবল নামেমাত্র থাকলেও তাদের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীরা গুদামে ধান সরবরাহ করেছেন। স্থানীয় কৃষকদের প্রশ্ন, কৃষক তালিকা তৈরি, জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই এবং ব্যাংক হিসাব খোলার মতো সংবেদনশীল প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে এত ত্রুটিপূর্ণ হলো। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই কি এসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে, নাকি কোনো সিন্ডিকেট চক্রের অপতৎপরতায় এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে?

অনুসন্ধানে কৃষক তালিকার বেশ কিছু অসঙ্গতি সামনে এসেছে। তালিকায় থাকা কৃষক জাকারিয়ার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভকারী ব্যক্তি নিজেকে মুন্না পরিচয় দিয়ে জানান, তিনি জাকারিয়া নন এবং তার ফোন নম্বর সেখানে কীভাবে এলো তা তিনি জানেনই না। এ ছাড়া তালিকায় থাকা কৃষক তৌহিদ হাসান জানান, তিনি নিজে কোনো ধান দেননি; তবে তার ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে চকচকা আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক গোলাম রাব্বানী গুদামে ধান সরবরাহ করেছেন। অথচ তিনি নিজে ধান দেওয়ার ন্যূনতম সুযোগ পাননি। একইভাবে কৃষক তালিকায় নাম থাকা ইমামুল ইসলাম অনেক চেষ্টা করেও গুদামে ধান দিতে পারেননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, আমিনুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোন রিসিভকারী নিজেকে সাখাওয়াত হোসেন হিসেবে পরিচয় দেন। অথচ কৃষক তালিকায় সাখাওয়াত হোসেনের নাম আলাদাভাবেও রয়েছে। ফলে একই মোবাইল নম্বর একাধিক ব্যক্তির নামে ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। তালিকাভুক্ত কৃষক আবুল কাসেম ম-লের কাছে ধান দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ‘আমি ৩ টন ধান সরবরাহ করেছি’ বলে ফোন রেখে দেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকেই সাখাওয়াত হোসেন নামের এক ব্যক্তি কোনো কিছু না শুনেই ক্ষিপ্ত হয়ে গণমাধ্যমকর্মীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, তাদের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিরা অসৎ উদ্দেশ্যে ধান সরবরাহ করে সরকারি সুবিধা আত্মসাৎ করেছেন। এর ফলে প্রকৃত কৃষকেরা সরকারি ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ বিষয়ে হিলি সরকারি খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাজেদুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, তিনি বর্তমানে দাপ্তরিক কাজে বাইরে আছেন। অফিসে ফিরে বিষয়টি বসে দেখবেন এবং প্রাপ্ত অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখবেন। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেওয়ান মো. আতিকুর রহমান বলেন, কৃষক তালিকা যাচাই-বাছাই করে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইউএনও জর্জ মিত্র চাকমা জানান, কৃষক তালিকায় বেশ কিছু অসঙ্গতির বিষয় ইতোমধ্যে তাদের নজরে এসেছে। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মনিরুল ইসলাম জানান, কৃষক তালিকা কৃষি বিভাগ প্রস্তুত করে আমাদের সরবরাহ করেছে।

আমরা ব্যক্তিগতভাবে কৃষকদের চিনি না, সরবরাহকৃত তালিকা অনুযায়ীই ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত কৃষকরা ধান দিতে না পারার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি প্রকৃতপক্ষে এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তবে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।