কক্সবাজার–সেন্ট মার্টিন নৌরুটে চলাচলকারী কোনো পর্যটকবাহী জাহাজেরই নেই শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। চলতি পর্যটন মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ঝুঁকি নিয়েই এসব জাহাজে যাতায়াত করছেন হাজারো পর্যটক। চলাচলের অনুমতি পাওয়া প্রতিটি জাহাজেই রয়েছে এক বা একাধিক নিরাপত্তা ত্রুটি ও শর্ত লঙ্ঘনের ঘটনা।
গত ২৭ ডিসেম্বর সেন্ট মার্টিনগামী একটি জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটার পর বিষয়টি প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর হয়। এরই প্রেক্ষিতে চলতি মৌসুমে চলাচলের অনুমতি পাওয়া ৭টি পর্যটকবাহী জাহাজের মধ্যে এমভি এলসিটি কাজল ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজ-এর অনুমোদন ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।
এরপর, গত ৩০ ডিসেম্বর ভোররাতে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়ারছড়া এলাকায় অবস্থিত বিআইডব্লিউটিএ জেটি ঘাটে পর্যটক যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে যৌথ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে জাহাজগুলোতে নানা ধরনের গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি ও শর্ত লঙ্ঘনের বিষয় শনাক্ত হয়।
এ বিষয়ে কোস্টগার্ড নৌপরিবহন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ইতোমধ্যে লিখিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে চলাচলকারী জাহাজ হিসেবে যেগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি, এমভি কেয়ারি সিন্দাবাদ, এমভি বে-ক্রুজার, এমভি কেয়ারি ক্রুজ এন্ড ডাইন ও এমভি দি আটলান্টিক ক্রুজ।
কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনে এসব জাহাজে যেসব গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অনিয়মের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে, জাহাজগুলোর ন্যূনতম সেইফ ম্যানিং ডকুমেন্ট নেই। বিধি অনুযায়ী দুই জন মাস্টার ও দুই জন ড্রাইভার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে রয়েছে একজন করে।
ফায়ার ও সেইফটি প্ল্যান অনুযায়ী এলএসএ ও এফএফএ নেই। অধিকাংশ জাহাজে পর্যাপ্ত ও কার্যকর লাইফ জ্যাকেটের ঘাটতি রয়েছে।
সার্ভে সার্টিফিকেটে উল্লিখিত মাস্টারের নামের সঙ্গে বাস্তবে কর্মরত মাস্টারের নামের অমিল পাওয়া গেছে। মেইন ইঞ্জিন ওভারহলিং সংক্রান্ত কোনো ডকুমেন্ট নেই। বেশিরভাগ জাহাজে ফায়ার পাম্প কার্যকর অবস্থায় পাওয়া যায়নি, পাশাপাশি পর্যাপ্ত হোজ পাইপেরও অভাব রয়েছে।
ইঞ্জিনরুমে ফিক্সড কার্বন ডাই-অক্সাইড সিস্টেম নেই, ফায়ার কন্ট্রোল প্যানেল, ফায়ার অ্যালার্ম ও ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম কার্যকর নয়। জাহাজ পরিচালনাকারী মাস্টার ও ড্রাইভারদের বেসিক ফায়ার ফাইটিং ট্রেনিং সার্টিফিকেট নেই।
কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের আলোকে সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার অধিশাখার মহাপরিচালক কমোডর মো. শফিউল বারীর স্বাক্ষরিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে জাহাজগুলোর সব ত্রুটি ও বিচ্যুতি সংশোধনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব ত্রুটি সংশোধন করা না হলে সংশ্লিষ্ট পর্যটকবাহী জাহাজগুলোর চলাচলের অনুমতি বাতিল করা হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রস্তাবিত কক্সবাজার নদী বন্দর কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াকিল বলেন, ‘কোস্টগার্ডের প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জারি করা প্রজ্ঞাপন এখনো দাপ্তরিকভাবে হাতে পাননি। তবে বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিত হয়েছেন।’
তিনি আরও জানান, ‘যৌথ অভিযানে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষও জাহাজগুলোতে উল্লেখযোগ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রজ্ঞাপনটি হাতে পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ও নৌ-নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সেন্টমার্টিন রুটে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন