শহরের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু খুব কম মানুষই সেই স্বপ্নকে নিয়ে পৌঁছাতে পারেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের চূড়ায়। সিলেটের সন্তান, ব্রিটেনে বসবাসরত পর্বতারোহী আখলাকুর রহমান যিনি আকি রহমান নামে পরিচিত ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছেন। প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি মুসলিম হিসেবে দুইবার মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে তিনি আজ সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিকতার এক অনন্য প্রতীক।
সম্প্রতি সিলেট সফরে এসে নগরীর একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে ‘দৈনিক রুপালী বাংলাদেশ’ পত্রিকার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় বসেন আকি রহমান। চায়ের কাপে চুমুক, মুখে সহজ হাসি আর কথার ফাঁকে উঠে আসে এভারেস্ট জয়ের রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম আর স্বপ্নের গল্প।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল: মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের পথে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কোনটি? আকি রহমান বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসিক চাপ। পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং পাহাড়ের নিঃসঙ্গতা।
আকি রহমান বলেন, যদি একটি মুহূর্ত বেছে নিতে হয়, তবে সেটা ছিল আমার প্রথম সামিটের সময়, যখন আমি একটি ক্রেভাসে (হিমবাহের ফাটল) পড়ে গিয়েছিলাম এবং সেখানে ৪০ মিনিট ঝুলে ছিলাম। তখন আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছিল এবং আমি তাদের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম, যারা আমাকে বলেছিল সেখানে না যেতে, কারণ এটা বিপজ্জনক। বরফাচ্ছন্ন সেই শূন্যতায় ঝুলে থেকে মানসিক সেই ফাঁদ কাটিয়ে ওঠাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
তিনি আরও বলেন, শৃঙ্গের কাছাকাছি পৌঁছানোর সময় অক্সিজেনের মাত্রা ভয়াবহভাবে কমে গিয়েছিল। হিমবাহে চলাচল ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শরীর ও মন দুটোই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়টাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। তবে লক্ষ্য পরিষ্কার থাকায় নিজেকে সামলাতে পেরেছি।
ভয় ও অনিশ্চয়তা কীভাবে মোকাবিলা করেছেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভয় স্বাভাবিক। কিন্তু ধৈর্য আর সাহস দিয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। প্রতিটি মুহূর্তে শুধু সামনের এক পা এগোনোর দিকেই মনোযোগ রাখতে হয়—অতীত বা ভবিষ্যৎ নয়। এই মনোবলই আমাকে চূড়ায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। যদি ভয় থাকত, তবে বেস ক্যাম্পেই পৌঁছাতে পারতাম না। আমরা ভয়কে ঝেড়ে ফেলে লক্ষ্যে মনোযোগ দিই। আমার লক্ষ্য ছিল সামিট অর্জন এবং দাতব্য কাজের জন্য তহবিল সংগ্রহ।
তিনি জানান, তার প্রথম আরোহনে ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করা হয়, যার অধিকাংশ অর্থ বাংলাদেশজুড়ে মানবিক প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে।
তরুণ প্রজন্মের প্রসঙ্গ উঠলে আকি রহমান বলেন, স্বপ্ন দেখলে থামবেন না। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবল থাকলে যে কোনো উচ্চশৃঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব। দেশের তরুণরা নিজেদের বিশ্বাস করুন, সুযোগ তৈরি করুন এবং সাহসী হন। ‘বিশ্বাসই অর্জনের চাবিকাঠি।’
আপনার ‘পাহাড়’ যদি বাস্তব কোনো চূড়া না-ও হয়, বরং জীবনের কোনো লক্ষ্য হয়—তবুও যদি সত্যিকারের বিশ্বাস করেন, তা অর্জনের শক্তি আপনি খুঁজে পাবেন। কখনও কাউকে আপনার স্বপ্নকে তুচ্ছ করতে দেবেন না।”

এভারেস্ট জয় কি আগে থেকেই স্বপ্ন ছিল, নাকি হঠাৎ পাওয়া সুযোগের প্রশ্নে তিনি বলেন, স্বপ্ন আগে থেকেই ছিল। তবে সঠিক সময়, সুযোগ ও পরিকল্পনার সঙ্গে মিলেই সেটাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া গেছে। শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না স্বপ্নকে বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ দিতে হয়। ছোটবেলায় টেলিভিশনে অনুষ্ঠান দেখে এভারেস্ট আরোহনের কল্পনা করতাম।
পরবর্তীতে জীবনের এক পর্যায়ে পর্বতারোহণের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়। কয়েকটি সফল শৃঙ্গ জয়ের পর এভারেস্ট অভিযানের সুযোগ আসে। তখন ‘না’ বলার প্রশ্নই ছিল না যদিও অভিযানটি রমজান মাসে পড়েছিল। এটিকে আমি ঈমান ও শারীরিক সক্ষমতার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম।
সিলেট বিভাগের জগন্নাথপুরে জন্ম নেওয়া আখলাকুর রহমান ছোটবেলা থেকেই পর্বতারোহণে আগ্রহী ছিলেন। ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন পাহাড়ে অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। যুক্তরাজ্যের মাউন্ট স্নোডন ও ইউরোপের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসসহ একের পর এক শৃঙ্গ জয় করে নিজেকে প্রস্তুত করেন এভারেস্টের জন্য। ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যে মাউন্ট এলব্রুসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে তিনি রেকর্ডও গড়েন।
পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে এভারেস্ট অভিযান ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কঠিন আবহাওয়া, চরম শারীরিক ক্লান্তি ও সীমিত খাবারের মধ্যেও ১৩ মে ২০২২ তিনি ৮,৮৪৯ মিটার উচ্চতার মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছান।
এই অভিযান ছিল শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য নয়। ‘পিক হিউম্যানিটি’শিখরে ওঠার সঙ্গে মানবতার সেবাকে একত্র করার একটি উদ্যোগের মাধ্যমে আকি রহমান শরণার্থী, নারী, শিশু ও অসহায় পরিবারদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন।
তিনি বলেন, পৃথিবী আজ কঠিন সময় পার করছে। যখন দেখি কোনো মা সন্তানকে খাওয়াতে পারছে না বা কোনো শিশু দুর্ভিক্ষে ভুগছে, তখন হৃদয় কেঁপে ওঠে। আমি তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ওল্ডহামে স্ত্রী হেনা রহমান ও তিন সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন আকি রহমান। প্রতিদিন প্রায় ১৫ কিলোমিটার দৌড়, নিয়মিত জিম ও মানসিক প্রস্তুতির মাধ্যমে তিনি নিজেকে এভারেস্ট অভিযানের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, এভারেস্টের পরও থামতে চাই না। বিশ্বের আরও উচ্চশৃঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে চাই। পাশাপাশি তরুণদের প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণায় কাজ করতে চাই। আমি কিলিমানজারোতে দ্রুত আরোহনের চেষ্টা করতে চাই, যাতে দ্রুততম বাংলাদেশি ও ব্রিটিশ আরোহী হতে পারি। এছাড়া এক অভিযানে তিনটি ৮,০০০ মিটার উচ্চতার শৃঙ্গ আরোহনের স্বপ্ন দেখি। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একজন পর্বতারোহী হিসেবে আমি একজন বাংলাদেশি স্পনসর চাই, যাতে বিশ্বের সর্বোচ্চ মঞ্চে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারি।
এভারেস্ট জয় ছাড়াও আকি নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আগ্রহী। তিনি বিশ্বের ১৪টি উচ্চতম পর্বত জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং মানবিক সহায়তায় আরও বৃহৎ তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছেন।
রাত গভীর হলেও আড্ডার উষ্ণতা কমেনি। আকি রহমান শুধু অভিযানের গল্পই শোনাননি—ছড়িয়ে দিয়েছেন স্বপ্ন পূরণের সাহস।
স্বপ্ন থেকে শৃঙ্গচূড়ায় পৌঁছানোর এই যাত্রায় আকি রহমান আজ শুধু একজন পর্বতারোহী নন—তিনি সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিকতার এক জীবন্ত উদাহরণ।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন