বর্ষায় আপন রূপ ফিরে পেয়েছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার আট ঝরনা। বছরের অন্য সময় ঝরনায় তেমন পানি না থাকলেও বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর ঝরনাগুলো। পানি বাড়ায় পর্যটকদের আগমনও বেড়ে গেছে। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে এসব ঝরনায় বেড়াতে ছুটে যাচ্ছেন শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষ। বিশেষ করে ছুটির দিনে পর্যটক বেড়ে যায় কয়েকগুণ বেশি। ঝরনার পাশাপাশি উপজেলার অন্যান্য পর্যটন স্পটও ঘুরে দেখছেন সবাই।
বন্ধু-সহপাঠী, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ঝরনার স্বচ্ছ পানিতে ঘা ভেজানোর জন্য সবাই ছুটে যাচ্ছে বিভিন্ন পাহাড়ি ঝরনায়।
জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলা ঝরনার রানি হিসেবে সারা দেশে পরিচিত। সেখানে বছরের যেকোনো সময় দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসে ভ্রমণপিপাসুরা। এখানে রয়েছে রূপসী ঝরনা, হরিনাকুণ্ড ঝরনা, নাপিত্তাছড়া ঝরনা, সোনাইছড়ি ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, সোনাইছড়ি ঝরনা, খৈয়াছরা ঝরনা ও মেলখুম ট্রেইলে। তবে প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে দুর্ঘটনার শঙ্কাও। পর্যটকদের অসচেতনতা, অনভিজ্ঞতা ও অতিরিক্ত সাহসিকতার কারণে প্রতিবছরই ঝরনাগুলোতে ঘটে নানা দুর্ঘটনা। তাই নিরাপদ ভ্রমণের জন্য মেনে চলতে হবে কিছু সতর্কতা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপসী, নাপিত্তাছড়া ও খৈয়াছরা ঝরনা রাস্তার মাথায় বেশকিছু বাস, মাইক্রো, প্রাইভেটকার দাঁড়িয়ে রয়েছে। এসব গাড়ি করে আসা সবাই ঝরনায় ঘুরতে গেছেন। আবার অনেক পর্যটক বিভিন্ন লোকাল বাসে এসে রাস্তার মাথায় নেমে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে ঝরনায় ছুটে যাচ্ছেন। পর্যটক বাড়ার কারণে বেড়েছে বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম বিক্রিও।
বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন বারৈয়ারঢালা জাতীয় উদ্যানের প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ একর বনাঞ্চলজুড়ে রয়েছে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, রূপসী, সোনাইছড়ি ও বাওয়াছড়া ঝরনা। আকৃতি ও সৌন্দর্যের কারণে খৈয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া ও রূপসী ঝরনায় পর্যটকের ভিড় সবচেয়ে বেশি ঝরনাগুলোতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ২০১০ সাল থেকে ইজারা দিয়ে আসছে বন বিভাগ। চলতি বছরের ২৩ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৪ মে পর্যন্ত এক বছরের জন্য ৪০ লাখ ১০০ টাকায় ঝরনাগুলোর ইজারা পেয়েছে থ্রি-বি নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সারা বছরই পর্যটকেরা এসব ঝরনায় এলেও বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এবার বৈশাখ মাসের ভারি বৃষ্টি এবং ঈদের দীর্ঘ ছুটি মিলিয়ে ঝরনাগুলোতে পর্যটকের চাপ বেড়েছে। সরকারি ছুটি ও উৎসবের দিনগুলোতে শুধু খৈয়াছড়া ঝরনাতেই দুই থেকে আড়াই হাজারের বেশি পর্যটক আসছেন।
কুমিল্লা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক শহিদুল ইসলাম বলেন, মিরসরাইয়ের অনেক ঝরনায় যাওয়া হয়েছে। এবার প্রথম রূপসী ঝরনায় এসেছি। রেললাইন পার হয়ে মূল ঝরনা পর্যন্ত আসতে দুপাশের সবুজ পাহাড়ের গাছ-গাছালি মুগ্ধ করেছে।
নাজমুল হক নামের আরেক পর্যটক বলেন, ‘আমরা চার বন্ধু মিলে ঢাকা থেকে নাপিত্তাছড়া ঝরনা দেখতে এসেছি। সবুজ পাহাড়, পাথুরে ঝিরিপথ আর ঝরনার স্বচ্ছ পানি দেখে মন ভরে গেছে।
নাপিত্তাছড়ায় প্রথম এসেছি। এর আগে খৈয়াছরা ঝরনায় যাওয়া হয়েছিল। দুই ঝরনা আকার-আকৃতি বৈশিষ্ট আলাদা ‘রূপসী ঝরনার ইজারা পাওয়া থ্রি-বি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা এস.এম হারুন বলেন, ‘বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্ষাকালে ঝরনাগুলোতে পর্যটক সবচেয়ে বেশি আসে। নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে আমরা প্রবেশপথে কাউন্সেলিং, সচেতনতামূলক ব্যানার, পোস্টার, পেস্টুন টাঙিয়ে প্রচার ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সব পর্যটককে সাথে গাইড নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।’
বারৈয়ারঢালা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, ‘এ বছর বৈশাখ থেকেই ঝরনাগুলোতে পানির প্রবাহ তৈরি হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে। নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ইজারাদারের সঙ্গে সমন্বয় করে ঝরনা এলাকায় হ্যান্ডমাইক প্রচার, নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ ও সচেতনতামূলক ব্যানার-পোস্টার স্থাপন করা হয়েছে।’
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখানকার পাহাড়ি ঝরনাগুলো আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন লোকজন এখানে ছুটে আসছেন।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, বন বিভাগ ও ইজারাদার সমন্বিতভাবে কাজ করছে। আরও ভালোভাবে কাজ করতে এবং ঝরনায় দুর্ঘটনা এড়াতে কিছুদিনের মধ্যে পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ট্যুরিস্ট গাইড, সংবাদকর্মী, ইজারাদারসহ স্থানীয়দের নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশলার আয়োজন করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন