ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

অস্তিত্ব সংকটে করতোয়া-বাঙ্গালী, হুমকিতে উত্তরাঞ্চলের জীবনধারা

নাজমুল হুদা নয়ন, শেরপুর (বগুড়া)
প্রকাশিত: মার্চ ২৮, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম
নাব্য সংকটে মৃতপ্রায় নদী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নদী আছে, কিন্তু নেই তার প্রাণ। এক সময়ের প্রমত্তা করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী আজ দখল, দূষণ ও নাব্য সংকটে ধুঁকছে নিঃশব্দে। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন এই নদীগুলো এখন যেন কেবল অতীতের স্মৃতি বহন করছে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কাশিয়াবালা গ্রামের অমলেশ হাওয়ালদার ছোটবেলা থেকেই নদীর সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন। বাবার কাছেই শিখেছিলেন মাছ ধরা। করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী ছিল তার জীবনের অংশ, আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সবকিছু। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময় নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। নাব্য সংকট ও দূষণের কারণে তার মতো অসংখ্য জেলের জীবিকা এখন হুমকির মুখে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুর উপজেলার প্রধান দুটি নদী করতোয়া ও বাঙ্গালী। করতোয়া নদী গাইবান্ধার কাটাখালী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ১২৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেরপুরের কল্যাণী ঘাট এলাকায় এসে বাঙ্গালী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অন্যদিকে বাঙালী নদী গাইবান্ধার আলাই নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ২১৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ‘ফুলজোর’ নাম ধারণ করে এবং শেষে হুরাসাগর নদীতে গিয়ে মিশেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এক সময়ের প্রশস্ত ও গভীর এই নদীগুলো এখন অনেক জায়গায় সরু, ভরাট এবং নাব্যহীন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও শুকনো মৌসুমে হেঁটে পার হওয়াও সম্ভব। খানপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আলম প্রামাণিক বলেন, ‘আগে বড় বড় নৌকা চলত, এখন শুকনো মৌসুমে মানুষ হেঁটে নদী পার হয়।’

বর্জ্যে ভরে গেছে নদী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

নদীর এই করুণ অবস্থার পেছনে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি রয়েছে মানুষের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা। শিল্পকারখানার বর্জ্য, পৌরসভার অনিয়ন্ত্রিত আবর্জনা ফেলা এবং কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে নদীর পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শেরপুর পৌর এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষের পয়োনিষ্কাশনের পানি সরাসরি করতোয়া নদীতে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন অংশে ময়লা ফেলে ভরাট করার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে দই-মিষ্টির কারখানা, রেস্তোরাঁ, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বর্জ্যও নদীতে মিশছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নদীর পানি দিন দিন আরও দূষিত হয়ে পড়ছে।

উত্তর সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশুতোষ সরকার বলেন, ‘কারখানার বর্জ্য আর ড্রেনের পানিতে করতোয়ার পানি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে নদীতে মাছ ছাড়া হয়েছিল, কিন্তু পরদিনই সব মাছ মরে ভেসে ওঠে।’

বারদুয়ারী হাট এলাকার বাসিন্দা আকরাম শেখ জানান, এক সময় করতোয়া নদী ছিল গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ‘ধান, গবাদিপশু, মাটির জিনিস, নারিকেল—সবই নৌকায় আনা-নেওয়া হতো। এখন নদী ভরাট হয়ে গেছে, নৌকা চলে না,’  বলেন তিনি।

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, শেরপুরের এসআর কেমিক্যাল লিমিটেড ও মজুমদার প্রডাক্টস নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সরাসরি করতোয়া ও বাঙ্গালী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ এলাকায় প্রবাহিত ফুলজোর নদীতেও। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং আন্দোলনের কথাও শোনা যাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অযত্ন-অবহেলায় দূষণে ভরে যাচ্ছে নদী। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

মজুমদার প্রডাক্টসের এইচআর অ্যাডমিন রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘ইটিপিতে পরিশোধনের পরই নদীতে পানি ছাড়া হয়, তাই দূষণের প্রশ্ন নেই।’

এসআর কেমিক্যাল লিমিটেডের কেমিস্ট ফারুখ আকন্দ জানান, আমাদের অধিকাংশ বর্জ্য পুনঃব্যবহার বা বিক্রি করা হয়। অবশিষ্ট অংশ ইটিপিতে পরিশোধন করে পুনরায় ব্যবহার করা হয়। নদীতে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ সঠিক নয়।

শেরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘নাব্য সংকট ও দূষণের কারণে করতোয়া ও বাঙ্গালী নদী এখন মৃতপ্রায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে নদীগুলোকে আবারও আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’