খুলনার শিল্প ও কৃষি খাত ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত সরকারের ভুল নীতি ও ব্যাপক লুটপাটের কারণে একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামী আল্লাহর ইচ্ছায় ও জনগণের রায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বন্ধ মিলকারখানা পুনরায় চালু করা হবে এবং নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন করা হবে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর ২টা থেকে খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা মহানগরী ও জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও খুলনা মহানগর আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, 'আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিয়ে অপমান করতে চাই না। আমরা তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে যুবসমাজকে সম্মানিত করতে চাই। জুলাই বিপ্লবে যুবসমাজ যে ভূমিকা রেখেছে, তার ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করতে চাই। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনো মামা-খালু চলবে না, ন্যায় ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই চাকরি দেওয়া হবে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও হানাহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, 'একদিকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মা-বোনদের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে। যারা মাকে অসম্মান করছে, তারা ক্ষমা চেয়ে জনগণের রায়ের ওপর আস্থা রাখুক।' তিনি হামলাকারীদের উদ্দেশে বলেন, 'এখনই যদি মাথা এত গরম থাকে, তাহলে চৈত্র এলে কী করবেন?'
ডা. শফিকুর রহমান জনসভায় উপস্থিত নেতাকর্মীদের ভোটের পাহারাদার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'প্রত্যেকটি নারী-পুরুষের ভোটের অধিকার রক্ষা করতে হবে। ভোট যার যেখানে ইচ্ছা সেখানে দেবে, আমরা শুধু ভোটারকে নিরাপদে বাক্স পর্যন্ত পৌঁছে দিতে চাই।' তিনি বলেন, '১৩ ফেব্রুয়ারি আমি একটি অভিশাপমুক্ত বাংলাদেশ চাই।' এ সময় তিনি দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এবং এর আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহত, পঙ্গু, কারা নির্যাতিত, গুম ও দেশান্তরিতদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুটপাট করে তারা বিদেশে বেগমপাড়া বানিয়েছে।' তিনি বলেন, অতীতে জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর চরম জুলুম চালানো হলেও ৫ আগস্টের পর জামায়াত প্রতিহিংসার পথে হাঁটেনি; বরং দেশের নিরাপত্তায় পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে—দেশের মানুষ কার কাছে নিরাপদ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সন্ত্রাস, গুজব ও দুর্নীতির মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, জনগণ তাদের আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে খুলনা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন, বিশেষায়িত হাসপাতালের আধুনিকায়ন, বন্ধ মিল-কারখানা চালু, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ, আধুনিক বিমানবন্দর স্থাপন এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প বিকাশ করা হবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিবিরের বিজয়ের পর চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগামী দিনে জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বিপ্লব-উত্তর নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।'
জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির নেতা রাশেদ প্রধান, খুলনা-৬ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা-৪ আসনের খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খুলনা-২ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এবং খুলনা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী বাবু কৃষ্ণ নন্দীসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতৃবৃন্দ।
হাজারো নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সার্কিট হাউজ মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে দুপুরের আগেই মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা জনসভায় যোগ দেন। জনসভার কার্যক্রম শুরু হয় খুলনা জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এর আগে ইসলামী সংগীত পরিবেশন করে প্রেরণা সাহিত্য সংসদ ও টাইফুন শিল্পী গোষ্ঠী।

