ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

লালমনিরহাটে সব প্রার্থীর ইশতেহারে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি

কালীগঞ্জ (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

উত্তরের তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট জেলার তিনটি সংসদীয় আসনের লক্ষাধিক ভোটার এবারও নির্বাচনের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। লালমনিরহাটের তিনটি আসনের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর ইশতেহারেই রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি।

বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। তিস্তাকে ঘিরে তিস্তাপাড়ের ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে প্রার্থীরা নদীঘেঁষা চরাঞ্চলে নির্বাচনী সভা, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগ চালিয়েছেন।

এদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রংপুর ও নীলফামারীর নির্বাচনি জনসভায় ঘোষণা করেছেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান লালমনিরহাট ও নীলফামারীর জনসভায় বলেছেন, ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে সবার আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে।’

কিন্তু বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি শুনে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে জমেছে ক্ষোভ ও হতাশা। অনেকেই বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন তাদের কাছে ‘মুলা ঝুলানো’ গল্পে পরিণত হয়েছে। ভোট এলেই তিস্তা আলোচ্য বিষয় হয়, ভোট শেষ হলে আবার হারিয়ে যায়।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের আফাজ আলী বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা শুধুই প্রতারণা করছেন। নির্বাচিত হওয়ার আগে তিস্তাকে নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারও তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দিয়ে বলেছিল, ‘২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে’, কিন্তু তা করেনি। এখন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বাস্তবে তারা ভোট নেওয়ার কৌশল হিসেবে এ গল্পকে বেছে নিয়েছে। এবার আমরা দেখেছি শুনেই ভোট দেব।’

আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধান এলাকার কৃষক আহেদুল মিয়া জানান, ‘আমার জমি-জমা বাস্তভিটা সঙ্গে তিস্তার পানি চলি যাচ্ছে। আমাদের এ্যালা কামলা দিয়ে সংসার চালাই। তিস্তা সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ বছর ধরে শুনছি, কিন্তু এ পর্যন্ত কেউ কিছুই করেনি। ভোট এলে সবাই আমাদের কাছে আসে আর ভোট চায়। সবাই বলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। আমার বিশ্বাস হয় না।’

কাকিনা মহিষামুড়ি চরের রমজান আলী জানিয়েছেন, ‘এখন তিস্তা মহাপরিকল্পনা আমাদের কাছে ‘মুলা ঝুলানো’ গল্পের মতো মনে হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্ভাবনা বেশি ছিল, কিন্তু বর্তমান সরকারের সময় তা হলো না। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক নেতাদের আশ্বাসে আমাদের বিশ্বাস নেই।’

লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমাদের দলের স্পষ্ট অঙ্গীকার এবং আমার নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান বিষয়।’

বিএনপির প্রার্থী রোকন উদ্দিন বাবুল বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হলে কালীগঞ্জ উপজেলার নদীবেষ্টি তিনটি ইউনিয়ন—ভোটমারী, তুষভান্ডার, কাকিনা—ও আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের মানুষের জন্য কাজ করবো। প্রতি বছর এই চার ইউনিয়নের মানুষ দূর্ভোগ পোহাতে হয়, তা কমানোর জন্য কাজ করবো।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী মমতাজ আলী শান্ত বলেন, ‘তিস্তা এই অঞ্চলের অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদ। তিস্তা ড্রেজিং ও খনন করে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট তৈরি করলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। নির্বাচিত হলে শুরুতেই এই বিষয়ে নজর দেব।’

লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসনের বিএনপি প্রার্থী ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘তিস্তা নদী রক্ষার আন্দোলনে আমি রাজপথে ছিলাম। তিস্তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর। জনগণের রায়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে—এটি দলের প্রতিশ্রুতি এবং আমার ইশতেহার।’

সব মিলিয়ে তিস্তাকে ঘিরে প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় কাটেনি তিস্তাপাড়ের মানুষের। তাদের প্রশ্ন একটাই—এই নির্বাচনেও কি তিস্তা থাকবে শুধু ভোটের স্লোগান হয়ে, নাকি সত্যিই শুরু হবে বহু প্রতীক্ষিত মহাপরিকল্পনার কাজ?