ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

রাণীশংকৈল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেন্ডার ‘রাজত্ব’ ১৭ বছরের

রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ৬, ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

রোগীদের খাবারে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার ও নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সরবরাহের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবুও ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাবার সরবরাহের টেন্ডার প্রায় ১৭ বছর ধরে একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান, সরকারি হাটের ইজারাদার ও ব্যবসায়ী হেদায়েতুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কৌশলে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতি বছর নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হলেও মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রায়ই দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। এতে করে একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে কাজটি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ পান।

সূত্র আরও জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আব্দুল মান্নান টেন্ডারসংক্রান্ত বিষয়ে ঠাকুরগাঁও আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার কারণে টেন্ডারের মেয়াদ শেষ হলেও পূর্ববর্তী ঠিকাদারের সাব-ঠিকাদার হিসেবে হেদায়েতুল্লাহ কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। এভাবে প্রায় ১৭ বছর ধরে তিনি হাসপাতালের খাবার সরবরাহের কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, কয়েক মাস আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়ে নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম খাবার সরবরাহের অভিযোগের সত্যতা পায়। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালের পর থেকে হেদায়েতুল্লাহ একাধিক ব্যক্তির নামে দরপত্র ক্রয় ও জমা দেন। এতে করে যেকোনো একটি নামে কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও তার প্যানেলের সোলাইমান নামের এক ঠিকাদার কাজটি পান। পরবর্তী অর্থবছরে কাজটি হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দায়েরের মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় ঠিকাদারেরা।

স্থানীয় ঠিকাদার মনির হোসেন বলেন, ‘প্রায় দুই বছর আগে নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার আহ্বান করা হলে হেদায়েতুল্লাহ অংশ নিয়েও কাজ পাননি। পরে তার মেয়ের জামাই আব্দুল মান্নানকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মামলা করানো হয়। সেই মামলার সুযোগ নিয়ে আগের ঠিকাদারের নামে সমঝোতার মাধ্যমে তিনি আবার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব অনিয়মের প্রতিবাদে এলাকাবাসীর উদ্যোগে মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু লোকজন আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তাকে টেন্ডার পেতে সহায়তা করেছেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হেদায়েতুল্লাহ বলেন, ‘আমিই ঠিকাদার। অনেক বছর ধরে কাজ করছি, সামনে আসেন, দেখা করেন।’ পরে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

সেই সময়ের টেন্ডার কমিটির সভাপতি ও মামলার বিবাদী সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদ চৌধুরী বলেন, ‘মামলার কারণে চূড়ান্ত দরপত্রদাতার নাম পাঠানো হয়নি। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। দুই পক্ষের বিরোধ থাকায় রি-টেন্ডারের রায়ের অপেক্ষা করা হচ্ছে।’

বর্তমান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল আহামেদ বলেন, ‘সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। আমি যোগদানের পর জানতে পারি, মামলা-জটিলতায় টেন্ডার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জেলায় পাঠানো হয়েছে।’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনিছুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। মামলা চলমান থাকায় দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।’