ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

একসময় ছিল রমরমা, এখন টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ

তাহেরুল ইসলাম তামিম, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও)
প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ১২:২৩ এএম
ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভান্ডারা গ্রামের ‘যোগিপাড়া’য় ঢুকলেই এখনও চোখে পড়ে মাটির কাজের চাকা। কোথাও সারি সারি শুকাতে রাখা মাটির ঘোড়া, কোথাও ছোট ছোট খেলনার হাড়ি-পাতিল, আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে প্রদীপ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ব্যস্ততা আগের মতোই আছে। মনে হয়, এই পাড়ার মানুষের জীবন এখনও মাটির গন্ধে আর মাটির রঙে রঙিন।

কিন্তু একটু কাছে গিয়ে কথা বললেই ভেসে ওঠে অন্য গল্প—কষ্টের, অনিশ্চয়তার ও টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প। এখানে এখনও ঘুরছে মাটির কাজের চাকা, কিন্তু থেমে যাচ্ছে মৃৎশিল্পীদের জীবনের চাকা।

একসময় এই যোগিপাড়ার প্রায় অর্ধশতাধিক হিন্দু পরিবারের প্রধান জীবিকা ছিল মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী উৎপাদন। নারী-পুরুষ মিলেই তৈরি করতেন ঘটি, টেপা পুতুল, ধূপদানি, মাটির ঘোড়া, সলতে জ্বালানোর প্রদীপ, মাটির ব্যাংক এবং শিশুদের খেলনার হাড়ি-পাতিলসহ নানা সামগ্রী। বছরের বিভিন্ন সময়ে মেলা বসলেই বেড়ে যেত ব্যস্ততা। কারিগরদের ঘরে ঘরে চলত দিন-রাত কাজ। বিক্রিও হতো ভালো। সেই আয়েই চলত সংসারের চাকা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই দৃশ্য। প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে মাটির তৈরি ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী। বাজারে এখন সহজলভ্য, টেকসই ও কম দামের প্লাস্টিক পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে মাটির জিনিসের ক্রেতা।

স্থানীয় মৃৎশিল্পী ননী বালা বলেন, ‘আগে এই কাজ করেই পরিবারের সব খরচ চলত। মেলা এলেই বিক্রির ধুম পড়ত। তখন দিন-রাত কাজ করতে হতো। এখন মেলা কমে গেছে, ক্রেতাও কমে গেছে। অনেক সময় তৈরি করা জিনিস ঘরে পড়ে থাকে।’

কথা বলতে বলতে তার চোখে যেন জমে ওঠে হতাশার ছাপ। তিনি বলেন, ‘আগে মনে হতো এই কাজ কখনও শেষ হবে না। এখন মনে হয়, আমাদের সঙ্গে হয়তো এই কাজটাও শেষ হয়ে যাবে।’

মেনেকা রাণী বলেন, ‘আগে এই কাজ করে সংসার ভালো চলত। এখন কাজ করছি, কিন্তু লাভ নেই। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নারী মৃৎশিল্পীরা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বিকল্প কাজ খুঁজে নিলেও নারীদের অনেকের সামনে তেমন সুযোগ নেই। ফলে তারা ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের বারবার পেছনে ঠেলে দিচ্ছে।

এই সংকটের কারণে অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয় কারিগর কবিনাথ বলেন, ‘অনেকে এখন দিনমজুরির কাজ করছেন। কেউ ভিটেমাটি বিক্রি করে ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গেছেন। কয়েকজন বিদেশেও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বাজার হারানোই নয়, দীর্ঘদিনের অবহেলাও এই শিল্পকে সংকটে ফেলেছে। মৃৎশিল্পীদের শিক্ষিত সন্তানেরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বাজারজাতকরণের সুযোগ এবং নিয়মিত মেলার ব্যবস্থা না থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে এই ঐতিহ্য হয়তো বিলীন হয়ে যাবে।

রাণীশংকৈল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, ‘কয়েক বছর আগে সীমিত পরিসরে কিছু মৃৎশিল্পীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় সবাইকে এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

ঠাকুরগাঁও বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র মৃৎশিল্পের উন্নয়নে ঋণ সহায়তা কার্যক্রমও রয়েছে।’