ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সরকারের সহযোগিতা চান শতাধিক সিনেমার অভিনেতা কালে খাঁ

রূপালী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম
অভিনেতা কালে খাঁ। ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

এক সময় রুপালি পর্দায় তার উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের বাড়তি উন্মাদনা। সব সুপার-ডুপার হিট সিনেমায় দাপিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই অভিনেতা কালে খাঁ আজ লোকচক্ষুর অন্তরালে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছেন। কাজ নেই, অর্থ নেই, আর তার ওপর জেঁকে বসেছে বার্ধক্যজনিত নানা রোগ।

সম্প্রতি দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সাক্ষাৎকারে এই প্রবীণ অভিনেতা তার জীবনের বর্তমান করুণ দশা তুলে ধরেন। অস্পষ্ট কণ্ঠে যখন তিনি তার সোনালি দিনের কথা বলছিলেন, তখন তার চোখে জল আর কণ্ঠে ছিল একরাশ হাহাকার।

কালে খাঁ জানান, এক সময় তিনি ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় সব প্রজেক্টে যুক্ত ছিলেন। তিনি যে সিনেমাগুলোতে অভিনয় করেছেন, তার অনেকগুলোই বক্স অফিসে দাপট দেখিয়েছে। কিন্তু আজ সেসব কেবলই স্মৃতি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার হাতে কোনো কাজ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ক্যামেরার সামনে না দাঁড়াতে পেরে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছেন তিনি।

পার্শ্ব চরিত্রের এই অভিনেতা বলেন, ‘মানুষ ভাবে আমরা খুব সুখে আছি। পর্দায় আমাদের হাসি দেখে তারা হাততালি দেয়, কিন্তু পর্দার পেছনের কান্না কেউ দেখে না। যে সিনেমায় অভিনয় করে প্রযোজক কোটি টাকা আয় করেছে, আজ সেই সিনেমার অভিনেতার ঘরে দুই বেলা খাবার জোটে না।’

শারীরিকভাবে অসুস্থ কালে খাঁ। মাঝে স্ট্রোক করেছিলেন। ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার চিকিৎসা করানোর মতো ন্যূনতম সামর্থ্যও তার হারিয়ে গেছে। অভাবের তাড়নায় যথাযথ চিকিৎসা নিতে না পারায় দিন দিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে।

কালে খাঁ বলেন, ‘প্রায় আড়াইশো সিনেমায় অভিনয় করেছি। দেশকে অনেক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছি। প্রযোজক বাড়ি-গাড়ি করেছেন, কিন্তু আমি কিছু পাইনি। শখ থেকে অভিনয়ে এসেছি। ওয়াসিম, নায়করাজ রাজ্জাক, সোহেল রানা, আলমগীর ভাইদের দেখে অভিনয়ের নেশা জেগেছিল। তাদের দেখে শিল্পী হওয়ার আগ্রহ হয়েছিল। এই শিল্পী পরিচয়ে আমি গর্বিত, কিন্তু কিছুই পাইনি। ঠিকমতো পারিশ্রমিকও পাইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক গুণী পরিচালক ও তারকা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু এ সময়ের পরিচালকরা আমাদের মূল্যায়ন করে না। একসময় আমার জন্য চার থেকে পাঁচটি ক্যামেরা বসে থাকত। এখন অভিনয় খুব মিস করি, কিন্তু কিছু তো করার নেই—এখন আর কেউ ডাকে না কাজের জন্য।’

সাক্ষাৎকারে বারবার উঠে এসেছে তার অসহায়ত্বের কথা। সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি জানান, চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার মতো ক্ষমতা তার নেই। অনেক শিল্পীই সরকারি অনুদান বা সহযোগিতা পান; কালে খাঁ-ও আশা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার দিকেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। শেষ বয়সে অন্তত একটু খেয়ে-পরে সম্মানের সঙ্গে মরতে চান এই প্রবীণ অভিনেতা।

তিনি বলেন, ‘আমি বিএনপির সমর্থক। যে কারণে বিগত ১৭ বছর কাজ পাইনি। এমনও হয়েছে, একা হরতাল নামিয়ে জেল খেটেছি। বর্তমান সরকার সংস্কৃতিমনা। তিনি যদি আমাকে একটু সহযোগিতা করেন, তাহলে শেষ বয়সে একটু ভালোভাবে কাটাতে পারব। গত সাত বছর ধরে হাতে কাজ নেই। কমেডি অভিনয় করি বলে আমাদের নিয়ে কেউ ভাবেও না। তা ছাড়া এখনকার পরিচালকরা ততটা মেধাবী নয়। আমাদের মতো শিল্পীদের তারা ব্যবহার করতে পারে না।’

এত সিনেমা করার পরও মূল্যায়ন হয়নি—এমন আক্ষেপ প্রকাশ করে এই অভিনেতা বলেন, ‘যার দরকার নেই, সেও সরকারি সহযোগিতা নিয়েছে; কিন্তু আমাদের মতো শিল্পীদের মূল্যায়ন হয়নি। সুপারহিট সব পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছি। শেষ বয়সে সরকারের সহযোগিতা চাই।’

চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের অভিনেতা থেকে আজকের তারকা শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করেছেন এই অভিনেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন ওয়াসিম, রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, রাজীব, নাসির খান, মাস্টার শাকিল, আমিন খান, শাকিব খান, রিয়াজ প্রমুখ।

তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমা হচ্ছে ‘শ্যামল ছায়া’, ‘ধর্ম আমার মা’, ‘দ্বীন দুনিয়া’, ‘মাটির ফুল’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘রাক্ষুসী’, ‘রং নাম্বার’, ‘সন্তান আমার অহংকার’, ‘বস্তির রানী সুরিয়া’, ‘সেরা নায়ক’, ‘প্রেম সংঘাত’ ইত্যাদি।

ঢালিউডের সোনালি দিনের এই অভিনেতা আজ বিনোদন জগতের মানুষদের কাছেও প্রায় বিস্মৃত। কালে খাঁর মতো গুণী শিল্পীরা যখন বিনা চিকিৎসায় আর অনাহারে ধুঁকে মরেন, তখন তা গোটা ইন্ডাস্ট্রির জন্যই এক লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি তার এই আর্তনাদ শুনবেন? এখন দেখার বিষয়, এই প্রবীণ অভিনেতার জীবনের শেষ সময়ে সরকারি বা কোনো বেসরকারি সহযোগিতা পৌঁছায় কি না।