বন্দিদের জন্য প্যারোল কেবল সাময়িক মুক্তি নয়—এটি আইন ও নীতিমালার সঙ্গে সংযুক্ত একটি বিশেষ ব্যবস্থা, যা কঠোর নিয়মের মধ্যেই সম্ভব। ভিন্ন পরিস্থিতিতে, যেমন কাছের আত্মীয়ের মৃত্যু বা বিশেষ সরকারি আদেশের ক্ষেত্রে, বন্দিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাগার থেকে মুক্ত রাখা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্যারোলের জন্য কে অনুমতি দেয়, কী শর্তে মুক্তি পাওয়া যায় এবং কতক্ষণ পর্যন্ত বন্দি ছাড়া থাকতে পারে? এই নিবন্ধে আমরা প্যারোলের পুরো প্রক্রিয়া, অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ এবং সময়সীমা সহ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছি।
প্যারোল কী?
আইনের ভাষায় প্যারোল হলো শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি। নির্দিষ্ট শর্ত মেনে কোনো আসামিকে কিছু সময়ের জন্য কারাগার থেকে ছাড়া বা সাময়িকভাবে মুক্ত রাখা বা কারাগারের বাইরে রাখার প্রক্রিয়াকেই প্যারোল বলা হয়। বাংলাদেশে প্যারোল-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং হালনাগাদ করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। সর্বশেষ নীতিমালাটি করা হয় ২০১৬ সালের ১ জুন এবং এটি এখনও কার্যকর রয়েছে।
প্যারোল শুধু বন্দির সুবিধার জন্য নয়; এটি নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মিলিয়ে আইনানুগভাবে পরিচালিত হয়। প্যারোলের সময় বন্দি পুলিশের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে থাকে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পুনরায় কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়।
প্যারোলে মুক্তির অনুমোদন কে দেয়?
নীতিমালা অনুযায়ী, প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা জেলা প্রশাসক বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে থাকে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে মূলত প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ধরা হয়।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে:
- কোনো বন্দি যদি নিজ জেলার কেন্দ্রীয়, জেলা, বিশেষ কারাগার বা সাব জেলেতে আটক থাকে, তবে ওই জেলার অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ তাকে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারেন।
- যদি বন্দি অন্য জেলায় অবস্থান করে, তবে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনা করে প্যারোল মঞ্জুর করা হয়।
- প্যারোল মঞ্জুর করার সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা এবং লজিস্টিক বিষয়গুলোও বিবেচনা করা হয়।
প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়?
নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে যে, বন্দির কাছের আত্মীয়—যেমন মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান বা ভাই-বোন—মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে।
এছাড়া আদালতের আদেশ বা সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া সম্ভব। বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার প্যারোলের সময়সীমা বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতাও রাখে।
প্যারোলে মুক্তির সময়সীমা
নীতিমালা অনুযায়ী, প্যারোলে মুক্তির সময়সীমা সাধারণত ১২ ঘণ্টার বেশি হতে পারে না। সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও দূরত্ব বিবেচনা করা হয়।
প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সময়সীমা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দূরত্ব বেশি হলে মুক্তির সময় বাড়ানো বা বিশেষ প্রয়োজনে কমানো যেতে পারে।
মুক্ত বন্দির নিরাপত্তা ও হস্তান্তর
নীতিমালা অনুযায়ী, প্যারোলে সাময়িক মুক্ত বন্দিকে সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারায় রাখতে হয়। কারা অধিদপ্তরের ফটকে পুলিশ তাকে গ্রহণ করে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনরায় কারাগারে হস্তান্তর করে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, “শুধু জেলা ম্যাজিস্ট্রেটই প্যারোল আবেদন মঞ্জুর করেন। কারা কর্তৃপক্ষের প্যারোল মঞ্জুর করার কোনো ক্ষমতা নেই। তবে বন্দি প্যারোল পেলে পুলিশ তাকে পুনরায় কারাগারে ফেরত দেয়।”
প্যারোল হলো বন্দির জন্য সীমিত সময়ের জন্য প্রয়োগযোগ্য বিশেষ অনুমতি, যা আইন ও নীতিমালা মেনে পরিচালিত হয়। এটি স্বাভাবিকভাবে নিরাপত্তা, দূরত্ব এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সীমিত সময়ের জন্য অনুমোদিত হয়। প্যারোলের অনুমোদন দেয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, এবং বন্দির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশ পাহারাও থাকে।
প্যারোল প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়নই নিশ্চিত করে, আইন মেনে বন্দিদের মানবিক সুবিধা দেওয়া যায়।


