ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

দেশে নতুন প্রাণঘাতী ভাইরাস শনাক্ত

রূপালী ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম
বাদুড়বাহিত নতুন এক ধরনের ভাইরাসের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ানো আরেকটি নতুন ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ভাইরাসটির নাম রিওভাইরাস (অর্থোরিওভাইরাস), যা মানুষের মধ্যে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় বাংলাদেশে পাঁচ জনের শরীরে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে একজন ২০২৪ সালে অজানা স্নায়বিক জটিলতায় মারা যান। গবেষণা প্রতিবেদনটি গত ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক রোগবিষয়ক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণার নেতৃত্ব দেন কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. নিশয় মিশ্র।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের মার্চের মধ্যে পাঁচ জন রোগী জ্বর, বমি, মাথাব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, লালা নিঃসরণ, শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক সমস্যার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিকভাবে তাদের নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হলেও পরীক্ষায় সবার ফল নেগেটিভ আসে।

পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারা আসলে প্টেরোপাইন অর্থোরিওভাইরাস (পিআরভি)-এ আক্রান্ত ছিলেন, যা একটি বাদুড়বাহিত রিওভাইরাস।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত পাঁচ জন রোগীই অসুস্থ হওয়ার আগে কাঁচা খেজুরের রস পান করেছিলেন। শীত মৌসুমে এই রস বাদুড়ের প্রিয় খাদ্য। বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রেও বাদুড়কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহক হিসেবে ধরা হয়।

গবেষকদের মতে, কাঁচা খেজুরের রসের মাধ্যমে নিপাহ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণঘাতী বাদুড়বাহিত ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে, এই গবেষণা তার স্পষ্ট প্রমাণ।

গবেষকেরা জানান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে পিআরভি সংক্রমণ সাধারণত মৃদু শ্বাসতন্ত্রের অসুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বাংলাদেশে শনাক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও স্নায়বিক জটিলতা দেখা গেছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভাইরাসটির জিনগত কাঠামোয় রিঅ্যাসর্টমেন্ট বা পুনর্বিন্যাস ঘটেছে, যার ফলে এর সংক্রমণ ক্ষমতা ও রোগ সৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে থাকতে পারে।

এই গবেষণায় রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয় ভিরক্যাপসেক-ভার্ট নামের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি, যা একসঙ্গে হাজারো ভাইরাস শনাক্ত করতে সক্ষম এবং প্রচলিত পিসিআর পরীক্ষার চেয়েও বেশি সংবেদনশীল। এর মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ ভাইরাস জিনোম বিশ্লেষণ ও ভাইরাস কালচার সফলভাবে করা হয়।

গবেষকেরা জানান, পদ্মা নদীর অববাহিকার আশপাশে ধরা পড়া বাদুড়ের মধ্যেও জিনগতভাবে মিল থাকা পিআরভি শনাক্ত হয়েছে। গবেষক আরিফুল ইসলাম বলেন, বাদুড় থেকে মানুষ ও গৃহপালিত প্রাণীতে ভাইরাস ছড়ানোর প্রক্রিয়া এবং এর পরিবেশগত প্রভাব বোঝার জন্য কাজ চলছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক ড. তাহমিনা শিরীন জানান, নিপাহ সন্দেহে পরীক্ষা করা প্রায় ১৩০ রোগীর মধ্যে পাঁচ জনের শরীরে রিওভাইরাস পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, নতুন রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু শনাক্তের নিয়মিত গবেষণার অংশ হিসেবেই এই পরীক্ষা করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, রিওভাইরাস সংক্রমণের জন্য নিপাহর মতো কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই একমাত্র উপায়। তিনি কাঁচা খেজুরের রস পান ও আংশিক খাওয়া বা পোকায় কাটা ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

গবেষকেরা যেসব এলাকায় কাঁচা খেজুরের রস পান করা হয় সেখানে শ্বাসতন্ত্রের রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে নিপাহ ভাইরাসের পাশাপাশি রিওভাইরাসসহ অন্যান্য বাদুড়বাহিত ভাইরাস পরীক্ষাকে চিকিৎসা নজরদারির অংশ করার সুপারিশ করেছেন।