ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার সরকারের সব উপদেষ্টার আয় ও সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করা হবে। এরই মধ্যে দেখতে দেখতে প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেছে, শেষ হতে চলেছে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ। তবে এখনো উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণাকে তখন ইতিবাচকভাবে দেখেছিল বিভিন্ন মহল। অর্থনীতিবিদ ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর শীর্ষ ব্যক্তিরা মনে করেছিলেন, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ না হওয়া সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অঙ্গীকার ভঙ্গের শামিল। এটি যেমন সরকারের জন্য বিব্রতকর, তেমনি দেশবাসীর জন্য হতাশাজনক এবং একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত।
নীতিমালা জারি হলেও প্রকাশ নেই
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণ পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে এবং ভবিষ্যতে তা সব সরকারি কর্মকর্তার জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় ১ অক্টোবর জারি করা হয় ‘অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশের নীতিমালা, ২০২৪’।
নীতিমালায় বলা হয়, উপদেষ্টা ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখের পরবর্তী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেবেন। প্রধান উপদেষ্টা তার বিবেচনায় উপযুক্ত পদ্ধতিতে তা প্রকাশ করবেন।
জমা পড়েছে, প্রকাশ হয়নি
সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ উপদেষ্টাই তাদের আয় ও সম্পদের বিবরণী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারসহ একাধিক উপদেষ্টা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিবরণী জমা দিয়েছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও জানিয়েছেন, তিনি ও তার স্ত্রীর আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছেন।
তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্পদের বিবরণী জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
নির্বাচন সামনে, প্রশ্ন আরও জোরালো
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, দুটি অর্থবছরের সময়সীমা পার হলেও এবং সরকারের মেয়াদ শেষপ্রান্তে পৌঁছেও কেন উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করা হয়নি?
সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, ‘আমরা আশা করছি, এটা অচিরেই দেখতে পাবেন। সময় শেষ হওয়ার আগেই প্রকাশ হবে।’
তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে জনমনে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

