আজ পবিত্র রমজানের চতুর্থ দিন। রহমতের এই দশকে মুমিন হৃদয়ে বইছে ইবাদতের হাওয়া। তবে রমজানের এই আধ্যাত্মিক আবহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ ‘জাকাত’। পবিত্র এই মাসেই অধিকাংশ সামর্থ্যবান মুসলিম তাদের জাকাত আদায় করে থাকেন। কিন্তু জাকাত কি কেবলই একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর মানবিক ও সামাজিক দর্শন?
কেন রমজানেই জাকাত?
ইসলামি শরিয়তে জাকাত আদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাস বেঁধে দেওয়া না হলেও রহমতের মাস হিসেবে রমজানকেই বেছে নেন অধিকাংশ মানুষ। এর কারণ হিসেবে ওলামায়ে কেরামরা জানান, রমজানে যেকোনো নফল ইবাদত ফরজের সওয়াব দেয় এবং প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি পায়। তাই বিত্তবানরা চান, তাদের জাকাতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সওয়াব হাসিল করতে।
জাকাতের ফজিলত : পবিত্রতা ও প্রাচুর্যের চাবিকাঠি
জাকাত শব্দের অর্থই হলো ‘পবিত্রতা’ ও ‘বৃদ্ধি পাওয়া’। সামাজিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে এর ফজিলত অপরিসীম। জাকাত দিলে সম্পদ কমে না, বরং অবশিষ্ট সম্পদ পবিত্র ও নিরাপদ হয়। এটি ধনীর সম্পদে দরিদ্রের যে অধিকার রয়েছে, তা আদায়ের মাধ্যমে সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করে।
গোনাহ মাফ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি : হাদিস শরিফে এসেছে, জাকাতদাতার গোনাহ সেভাবে নিভিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।
সামাজিক নিরাপত্তাবলয় : জাকাত কেবল দান নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। যদি সঠিক খাতে জাকাত বণ্টন করা হয়, তবে সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব।
মানবিক দৃষ্টিতে জাকাত : করুণা নয়, এটি অধিকার
জাকাত কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি গরিবের ‘প্রাপ্য অধিকার’। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। এমন সময়ে জাকাতের অর্থ যদি যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়, তবে তা অনেকের ইফতার ও সেহরির দুশ্চিন্তা দূর করতে পারে।
জাকাত কেবল কিছু শাড়ি বা লুঙ্গি বিতরণের নাম নয়; জাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একজন অভাবী মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলা, যাতে আগামী বছর তাকে আর জাকাত নিতে না হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাকাত দিতে গিয়ে জনসমাগম বা লৌকিকতার কারণে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। অথচ ইসলামে গোপনে দান করার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই আমাদের বার্তা হওয়া উচিত, জাকাত দিন সম্মান বজায় রেখে। লাইন ধরিয়ে লোক হাসিয়ে নয়, বরং অভাবী মানুষের দুয়ারে গিয়ে তার হক পৌঁছে দেওয়াই প্রকৃত মানবিকতা।
রমজানের এই রহমতের দিনে জাকাত হোক আর্তমানবতার সেবার বড় হাতিয়ার। বিত্তবানের সম্পদে ভাগ থাকুক নিঃস্ব মানুষের হাসির। সমাজের প্রতিটি স্তরে যখন জাকাত ব্যবস্থার সুষম বণ্টন হবে, তখনই রমজানের প্রকৃত শিক্ষা সার্থক হবে।


