বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যতিক্রমী আসর হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশের অংশগ্রহণ এবং মোট ১০৪টি ম্যাচ নিয়ে আয়োজিত এই বিশ্বকাপ শুধু ফুটবল উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি ও বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
এবারের বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। তিনটি দেশের সময়, আবহাওয়া ও ভৌগোলিক দূরত্বের ভিন্নতার কারণে খেলোয়াড়দের দীর্ঘ ভ্রমণ এবং ভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। একই সঙ্গে এত বড় আয়োজন পরিচালনা করাও আয়োজকদের জন্য বড় পরীক্ষা।
‘ইউনাইটেড ২০২৬’ নামে পরিচিত এই বিশ্বকাপকে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক উত্তর আমেরিকার ক্রীড়া কূটনীতির অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। বাণিজ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও, বিশ্বকাপ আয়োজন তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন বার্তা দিচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ঐক্য কতটা বাস্তব আর কতটা কূটনৈতিক প্রচারণা—তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বিশ্বকাপকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি ও জটিল ভিসা প্রক্রিয়া। দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে বহু সমর্থক, সাংবাদিক ও কর্মকর্তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ফিফার মূল দর্শন ‘সবার জন্য ফুটবল’ হলেও বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপেও। ইরানের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে মেক্সিকোয় আয়োজনের অনুরোধ জানানো হলেও ফিফা তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলস ও সিয়াটলের মতো শহরে, যেখানে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী ইরানীয় বাস করেন, সেখানে ইরানের ম্যাচ চলাকালে রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও নিরাপত্তা ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। যদিও খেলোয়াড়দের জন্য শেষ মুহূর্তে ভিসা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তবুও ইরানের দাবি—দলের কয়েকজন কর্মকর্তাকে এখনও প্রয়োজনীয় ভিসা দেওয়া হয়নি।
এদিকে মেক্সিকোর জন্য এই বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের একটি বড় সুযোগ। ড্রাগ কার্টেল সহিংসতা, মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নিখোঁজ নাগরিকদের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটি সমালোচনার মুখে রয়েছে।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মেক্সিকো সরকার নিজেদের নিরাপদ ও পর্যটকবান্ধব দেশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলছে—স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা কি দেশের বাস্তব সমস্যাগুলো আড়াল করতে পারবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে তিন আয়োজক দেশ ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শক্তি ও আধুনিকতার প্রদর্শন করতে চাইছে, মেক্সিকো ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে, আর কানাডা নিজেকে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ফলে মাঠে যখন ফুটবলাররা নৈপুণ্যের লড়াইয়ে মেতে উঠবেন, তখন ভিআইপি গ্যালারি ও কূটনৈতিক অঙ্গনেও চলবে আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা। তবুও বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর প্রত্যাশা—সব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ পর্যন্ত জয় হোক কেবল ফুটবলের।

