মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ উৎসব ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু জবেহ করার পর তার মাংস যেমন তিন ভাগে বণ্টনের নিয়ম আছে, তেমনি পশুর চামড়া বা তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিয়েও ইসলামের রয়েছে সুষ্পষ্ট বিধান। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী, কোরবানির চামড়ার পুরো অর্থই সমাজের দরিদ্র ও এতিমদের হক। এটি কোনোভাবেই অবহেলার বস্তু নয়, বরং তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া একটি আমানত।
শরিয়তের দৃষ্টিতে চামড়ার বিধান
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কোরবানি দাতা নিজে পশুর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ব্যবহার করতে পারেন। তবে যদি চামড়া বিক্রি করা হয়, তবে তার একটি পয়সাও দাতা নিজের কাছে রাখতে পারবেন না। বিক্রয়লব্ধ পুরো অর্থই সদকা করা ওয়াজিব বা আবশ্যক।
পশু জবাইয়ের মজুরি নয়:
অনেক সময় দেখা যায়, কসাই বা পশু জবাইকারীর পারিশ্রমিক হিসেবে চামড়া বা তার টাকা দিয়ে দেওয়া হয়। এটি ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েজ। কসাইয়ের মজুরি দাতাকে আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হবে; চামড়ার টাকা শুধু জাকাত নেওয়ার যোগ্য ব্যক্তি বা দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এতিম ফান্ডের প্রাপ্য।
যেখানে খরচ করা যাবে চামড়ার টাকা
কোরবানির চামড়ার অর্থ প্রধানত দুটি খাতে ব্যয় করা যায়:
১. দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তি: যারা সরাসরি জাকাতের হকদার, তাদের এই টাকা দান করা যাবে।
২. এতিমখানা ও মাদরাসা: দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে এবং এতিম শিশুদের ভরণপোষণের জন্য মাদরাসার ‘লিল্লাহ বোর্ডিং’ বা এতিম ফান্ডে এই টাকা প্রদান করা সবচেয়ে উত্তম হিসেবে গণ্য করা হয়।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সচেতনতা
কোরবানির সময় দেখা যায়, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। এতে জাতীয় অর্থনীতি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি বঞ্চিত হন দেশের লাখ লাখ সুবিধাবঞ্চিত মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চামড়ার উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা এবং তা দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এতিম ও দুস্থদের তহবিলে বড় অঙ্কের অর্থ জমা হওয়া সম্ভব।
আলেমদের অভিমত:
দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরামরা জানান, "কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা নিজের ভোগে লাগানো বা অপচয় করা গুনাহের কাজ। এই অর্থ গরিবের হক। তাই বাজারমূল্য অনুযায়ী চামড়া বিক্রি করে দ্রুত সেই টাকা পাওনাদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রত্যেক কোরবানি দাতার ধর্মীয় দায়িত্ব।"
কোরবানি দাতার প্রতি করণীয়:
চামড়া ছাড়ানোর সময় সতর্ক থাকা যাতে কাটছেঁড়া না হয়।
দ্রুত সময়ের মধ্যে চামড়া বিক্রি করে দেওয়া অথবা লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা।
বিক্রিত অর্থ কোনো প্রকার বিলম্ব না করে নিকটস্থ এতিমখানা বা পরিচিত অভাবী মানুষকে প্রদান করা।
কোরবানি কেবল পশু জবেহ করার নাম নয়, বরং ত্যাগের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যম। পশুর চামড়ার টাকা সঠিকভাবে বণ্টনের মাধ্যমেই কোরবানির এই মহান শিক্ষা পূর্ণতা পায়। আমাদের সামান্য সচেতনতা পারে একজন এতিম শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন