‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’, কবি কামিনী রায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘সুখ’-এর এ দুটি লাইন যেন মিলে গেছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হয়ে কাজ করা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের জন্য। জাতিসংঘের পক্ষে শান্তির অগ্রদূত (শান্তিরক্ষী) হয়ে বিশ্বশান্তিতে অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছে বাংলাদেশ সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনী। বিশ্বময় শান্তি রক্ষায় কাজ করতে গিয়ে গত ৩৯ বছরে জীবন উৎসর্গ করেছেন সেনা, নৌ ও বিমান এবং পুলিশ বাহিনীর ১৭৫ জন সদস্য। এসব মিশনে আহত হয়েছেন ২৮৭ জন। আফ্রিকা মহাদেশসহ যুদ্ধবিধস্ত এবং অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশগুলোতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জীবন বাজি রেখে সাহসিকতা, বুদ্ধিমত্তা আর পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের বীর সন্তানেরা। গত ২৯ মে ছিল আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস। তবে দিবসটি আজ পালন করছে বাংলাদেশ।
দিবসটি যথাযথ গুরুত্বসহকারে উদযাপন করতে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের মহাসচিব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশ বাহিনীর প্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার।
আমর্ড ফোর্সেস ডিভিশন (এএফডি) বা সশস্ত্র বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে, জাতিসংঘের ইরাক-ইরান সামরিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ মিশনে ১৫ জন পর্যবেক্ষক পাঠানোর মাধ্যমে। পরের বছর অর্থাৎ, ১৯৮৯ সালে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দেয় বাংলাদেশ পুলিশ। এরপর ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাতিসংঘের অভিযানে যোগ দেয়। ২০১১, ২০১৪, ২০১৫ ও ২০২১ সালে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় সেনা প্রেরণকারী দেশ ছিল। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশে^র প্রায় ৪৩টি দেশ বা স্থানে ৬৩টি শান্তিরক্ষা মিশন বা কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এসব মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ২ লাখ ৬ হাজার ৪৭৮ জন শান্তিরক্ষী অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি। বর্তমানে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকান, সাইপ্রাস, আবেই, ডিআর কঙ্গো, লেবানন, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইউএসএ ও পশ্চিম সাহারায় ৪ হাজার ২১২ জন সশস্ত্র বাহিনীর শান্তিরক্ষী মোতায়েন রয়েছেন।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে এক মহান উদ্দেশ্য সামনে রেখে বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল, দেশ ও সমষ্টিগত সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্বের সব মানুষকে একক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সংহতির বন্ধনে আবদ্ধ করাকে সামনে রেখে এই উদ্যোগের যাত্রা। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে অস্ত্রের প্রয়োগ পরিহার, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং প্রতিটি দেশের নিজস্ব শাসননীতির ওপর অন্য দেশ কিংবা প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং এর বাস্তবায়নই ছিল মূল প্রতিপাদ্য। আর এখানেই অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা, যা জাতিসংঘ স্বীকৃত। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘ইনভেস্ট ইন পিস বা শান্তিতে বিনিয়োগ’। জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, সীমিত সম্পদ ও জনবল দিয়ে সৃষ্ট সংঘাত মোকাবিলা করা, চলমান যুদ্ধ বন্ধ কিংবা বিরতির প্রশ্নে আলোচনা অব্যাহত রাখা এবং সব অবস্থায় বেসামরিক জনগণের জীবন ও জানমালের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং পূর্বে গৃহীত উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সবাইকে মানবিক ভূমিকা পালন ও বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করা উল্লেখযোগ্য কাজ। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অত্যন্ত পেশাদারিত্ব, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে চলছে। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী সদস্যদের কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী প্রশংসা ও ইতিবাচক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিশে^ প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর যথাযথ অর্থায়ন নিশ্চিত হলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী সদস্যরা আরও সুনাম ও সাফল্য অর্জন করতে পারবেন।
শান্তিরক্ষী মিশনে অংশ নেওয়া সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ আস্থার প্রতীক। বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও মানবিকতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত। ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে গঠিত মিশনের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন সামরিক পর্যবেক্ষক দিয়ে যাত্রা শুরু। জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ৯টি মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের ৪ হাজার ২১২ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। যেখানে নেতৃত্ব, সংখ্যাগরিষ্ঠতা, আত্মত্যাগ, সুনাম অর্জনসহ সার্বিকভাবে সম্মুখসারিতে প্রধান ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গোলোযোগপূর্ণ দেশগুলোতে নিজেদের উচ্চ পেশাদারিত্ব, মানবিক ও সহযোগিতা মূলক আচরণ দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হৃদয় জয় করছেন তারা। একইভাবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রসংশনীয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বেশ কিছু বাড়তি দায়িত্বও পালন করেন। বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকাও পালন করেন তারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত দেশ পুনর্গঠনে দক্ষতা দেখিয়ে তারা একদিকে পাচ্ছে স্থানীয়দের ভালোবাসা, অন্যদিকে অর্জন করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও। একসময় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করা বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এএফডির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বশান্তি রক্ষায় অভিযান চালাতে গিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১৭৫ জন জীবন উৎসর্গ করেছেন। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেই তাদের শহিদের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। জীবন উৎসর্গ করা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ১৩৮ জন সেনাবাহিনীর, ৪ জন নৌবাহিনীর এবং ৯ জন বিমান বাহিনীর। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের জীবন উৎসর্গকারী শান্তিরক্ষীর সংখ্যা ২৪। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ২৮৭ জন। আহতদের মধ্যে সেনাবাহিনীর ২৫৬ জন, নৌবাহিনীর ৯ জন বিমান বাহিনীর ৭ জন এবং পুলিশের ১৫ জন।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লে. কর্নেল সামি উদ-দৌলা চৌধুরী রূপালী বাংলাদেশকে জানান, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিম-লেও শান্তিরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনকারী দেশ হিসেবে ১১৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একাধিকবার শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী হিসেবে শীর্ষ অবস্থানে ছিল। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে শেষ করেছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সব ধরনের পরিবেশে কাজ করতে দক্ষ। তাই অনান্য দেশের সশস্ত্র বাহিনীর তুলনায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সহজেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন।
শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশ পুলিশ
বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের গর্বিত অংশীদার। ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের পদযাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ১ হাজার ৯২৮ জন নারী পুলিশসহ মোট ২১ হাজার ৮২৮ জন শান্তিরক্ষী ২৫টি দেশে ২৭টি শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারিত্ব ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় অনন্য অবদান রেখেছেন। হাইতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের ৫২৫ সদস্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের ৮ জন নারীসহ ৩৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা ইউনাইটেড নেশনস পুলিশে (ইউএনপোল) ও ইউএন জবে নিয়োজিত রয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ পুলিশের ২৫ জন সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা এ কে এম কামরুল আহসান রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষীরা নানা প্রতিকূলতা জয় করে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন এবং তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হাইতির ভূমিকম্পকবলিত মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আফ্রিকা ও ইউরোপের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতেও তারা অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশ পুলিশের এই অনন্য ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিম-লে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। প্রায় চার দশক ধরে বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের সংঘাত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশের গৌরবদ্দীপ্ত ও অনন্য অবদান বৈশ্বিক পরিম-লে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা বাড়িয়েছে। জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত থেকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ পুলিশ অঙ্গীকারবদ্ধ।
প্রসঙ্গত, প্রতি বছর ২৯ মে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। চলতি বছর ওই দিন সরকারি ছুটি থাকায় দিবসটি আজ ১০ জুন পালন করা হচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন