× UCB Sticker Card
সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শাহীনুর ইসলাম শানু

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৫:০৫ এএম

২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে কঠোর নীতিমালা

শাহীনুর ইসলাম শানু

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৫:০৫ এএম

২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব  আদায়ে কঠোর নীতিমালা

দেশে বৈধ তামাকের বাজার বেড়েছে মাত্র ৩০ ভাগ। অন্যদিকে সরকার অবৈধ পণ্যে বছরে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাজস্ব প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্য এবং বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিগারেট বাজারের প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ পণ্য অবৈধ।

ফলে সরকার শুধু বিপুল পরিমাণ রাজস্বই হারাচ্ছে না, বৈধ শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তাই বৈধ তামাকপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আদায়ে নতুন নীতিমালা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটে থাকবে বিশেষ কিউআর কোড। এ ছাড়া অবৈধ সিগারেটের বাজার ঠেকাতে নীতিমালায় থাকছে আরও অনেক নির্দেশনা।

এনবিআর সূত্র জানায়, সরকার প্রতিবছর তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় করে। একইসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন দৃষ্টি রাখছে সরকার। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় কর বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে ক্রমাগত বিস্তৃত হচ্ছে অবৈধ সিগারেটের বাজার। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই), বাজার বিশ্লেষক এবং রাজস্ব খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সিগারেট বাজারের প্রায় ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ এখন সম্পূর্ণ অবৈধ পণ্যের দখলে।

পরিসংখ্যান বলছে, এই অবৈধ বাজারের অংশ বর্তমানে প্রায় ১৩.১ ভাগ। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে দেশের বাজারে প্রবেশ করছে প্রায় ৮৩ কোটি ২০ লাখ শলাকা অবৈধ সিগারেট। বার্ষিক হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন শলাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভীতিকর তথ্য হলো, মাত্র এক বছরে এই অবৈধ বাজার বেড়েছে প্রায় ৩১ শতাংশ। রাজস্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, এই লাগামহীন পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে বার্ষিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

অবৈধ সিন্ডিকেট ও কর ফাঁকির মহোৎসব রুখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট বাস্তবায়ন ও আইটি অনুবিভাগ মাঠপর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশজুড়ে এনবিআর (তিন মাসে) মোট ১৩ হাজার ৪০৯টি অভিযান চালায়।

অভিযানে ভার্গো টোব্যাকোর ৫৫০ কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি ধরা পড়ে এবং মামলা করে এনবিআর। এ ছাড়া ৩ মাসে ৬ হাজার ৫০ কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায় বাড়ে, যদিও এখন তা অনেক কমে নেমে এসেছে।

অঞ্চলভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযানে সবচেয়ে শীর্ষে রয়েছে সিলেট কমিশনারেট, সেখানে ৩ হাজার ৬২১টি অভিযান চালানো হয়েছে। এর পরই রয়েছে রংপুর, সেখানে ২ হাজার ৫৫০টি, খুলনায় ১ হাজার ৮৯৭টি, রাজশাহীতে ১ হাজার ৩৭৮টি এবং চট্টগ্রাম ১ হাজার ৩২টি অভিযান চলে। এ ছাড়া ঢাকা অঞ্চলের চার ভাগে যথাক্রমে ঢাকায় (পশ্চিম) ১ হাজার ১৮টি, ঢাকা (দক্ষিণ) ৮৯৭টি, ঢাকা (উত্তর) ৪৪৭টি এবং ঢাকা (পূর্ব) ৩৫৪টি অভিযান পরিচালিত হয়। তবে সবচেয়ে কম অভিযান হয়েছে কুমিল্লায়Ñ ১৭১টি।

রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল মূলত বিদেশি সিগারেট চোরাচালানের প্রবেশপথ; অন্যদিকে রংপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও বগুড়া অঞ্চল দেশীয় অবৈধ উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই অবৈধ ব্যবসা মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট উপায়ে বা রুটে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমত ইলিসিট হোয়াইটস, যা দেশের ভেতরের অবৈধ কারখানায় উৎপাদিত হয়। যেখানে জাল ব্যান্ডরোল বা পুরোনো ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল পুনঃব্যবহারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি চোরাচালান; যেখানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ও নামিদামি ব্র্যান্ডের সিগারেট দেশে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন সময়ে বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি স্বাদের বিভিন্ন নামি ব্র্যান্ডের লাখ লাখ সিগারেট জব্দও করেছে কাস্টম। তৃতীয়ত, বাজারে প্রচলিত জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর প্যাকেট হুবহু নকল করে নি¤œমানের তামাক দিয়ে সিগারেট তৈরি ও বাজারজাতকরণের একটি বড় চক্র সক্রিয় রয়েছে।

তবে এই পুরো চক্রের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লাগছে রাজস্ব খাতে। এনবিআরের রাজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সিগারেট উৎপাদন মাত্র ১.৬৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও শুল্কের হার বাড়ানোর কারণে রাজস্ব আদায় বেড়েছে প্রায় ৪৭.৭৯ শতাংশ। বিপরীতে বৈধভাবে কর পরিশোধ করা সিগারেটের ব্যবহার বা ভোগ আশঙ্কাজনকভাবে কমছে।

আসছে কঠোর নিতিমালা : তামাক খাতের এই অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং তারা আধুনিক প্রযুক্তি ও ভুয়া নথি ব্যবহার করে দ্রুত অবস্থান বদলে ফেলে। যার কারণে শুধু এনবিআরের ম্যানুয়াল অভিযান দিয়ে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী অনুসৃত আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক সাতটি প্রধান সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এনবিআর। সেগুলো হলোÑ

ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস সিস্টেম : প্রতিটি সিগারেট প্যাকেটে একটি ইউনিক ডিজিটাল কোড থাকবে, যা কারখানায় উৎপাদনের সময় থেকেই সরকারি সার্ভারে নিবন্ধিত হবে। কারখানা থেকে বের হওয়া, ডিস্ট্রিবিউটরের গুদামে পৌঁছানো, পাইকারি বাজারে বিক্রি এবং খুচরা দোকানে সরবরাহÑ প্রতিটি ধাপ ডিজিটালভাবে রেকর্ড করা হবে। এতে জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে এবং কোনো কারখানা উৎপাদন গোপন রেখে বাজারে পণ্য ছাড়তে পারবে না।

প্যাকেটে কিউআর কোড যুক্ত : সিগারেটের প্যাকেটে বিশেষ কিউআর কোড থাকবে, যা সাধারণ ভোক্তা বা পরিদর্শক মোবাইল ফোন দিয়ে স্ক্যান করলেই উৎপাদনের তারিখ, কারখানার নাম, ব্যান্ডরোল নম্বর এবং ভ্যাট-সম্পূরক শুল্ক পরিশোধের রিয়েল-টাইম তথ্য দেখতে পাবেন। এতে ভোক্তারাও নজরদারির অংশ হয়ে উঠবেন এবং জাল পণ্য সহজে ধরা পড়বে।

ডিজিটাল ব্যান্ডরোল মনিটরিং : কাগজভিত্তিক ব্যান্ডরোলের দুর্বলতা দূর করতে প্রতিটি ব্যান্ডরোলে একটি ইউনিক সিরিয়াল থাকবে, যা একবার ব্যবহৃত বা স্ক্যান হলেই সার্ভারে ‘কনজিউমড’ বা ব্যবহৃত হিসেবে দেখাবে। একই কোড দ্বিতীয়বার ব্যবহার করার চেষ্টা করলেই সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট তৈরি হবে।

মাল্টি-এজেন্সি টাস্কফোর্স : অবৈধ সিগারেট ব্যবসা চোরাচালান, অর্থপাচার ও সংগঠিত অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাই শুধু এনবিআর দিয়ে এটি উপড়ানো সম্ভব নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টম, ভ্যাট গোয়েন্দা, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, সিআইডি, এনএসআই এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিয়ে একটি স্থায়ী যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করার পরামর্শ।

এআইভিত্তিক ঝুঁঁকি বিশ্লেষণ : একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে কাঁচামাল আমদানি, তামাক ক্রয়, ব্যান্ডরোল ইস্যু ও ভ্যাট রিটার্নের তথ্য যুক্ত থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সহজেই অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করতে পারবে। যেমন, কোনো কোম্পানি যদি বিপুল পরিমাণ তামাক কিনেও কম উৎপাদনের ভ্যাট রিটার্ন দেয়, সিস্টেম তাকে ‘উচ্চ ঝুঁকির এনটিটি’ হিসেবে চিহ্নিত করবে।

কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস : শুধু আইন প্রয়োগ করে লাভ হবে না, যদি বৈধ ও অবৈধ সিগারেটের দামের ব্যবধান আকাশচুম্বী হয়। তাই জটিল শতাংশভিত্তিক ট্যাক্স কমিয়ে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থা বা নির্দিষ্ট কর পদ্ধতিতে যেতে হবে, যাতে কর ফাঁকির প্রণোদনা হ্রাস পায়।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আইনি ও প্রশাসনিক সুরক্ষা : অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক চাপ থেকে রক্ষা করতে নির্দিষ্ট মেয়াদে বদলি সীমিত করা, আইনি সুরক্ষা দেওয়া এবং সফল অভিযানের জন্য পুরস্কারভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অবৈধ পণ্যের উৎপাদনে কোনো প্রকার মান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সম্পূর্ণ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অননুমোদিত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও নিম্নমানের বিষাক্ত তামাক মিশ্রিত করে এগুলো তৈরি হয়। তাই সস্তা সিগারেটগুলো সাধারণ বৈধ সিগারেটের চেয়েও বহুগুণ বেশি প্রাণঘাতী ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দেশের অর্থনীতিকে এই বিশাল ক্ষত থেকে বাঁচাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে অবৈধ তামাকের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কর কাঠামোর আধুনিকায়নে জোর দিচ্ছে সরকার।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!