আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট দেশের অর্থনীতির সামনে এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে। একদিকে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা, এই দুই সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সরকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবতা কি সেই লক্ষ্য অর্জনের পক্ষে অনুকূল?
চলতি অর্থবছরের দশ মাসেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বছর শেষে এই ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেট আয়ের প্রায় ৮৭ শতাংশ। অথচ রাজস্ব প্রশাসনে মৌলিক সংস্কার, করজাল সম্প্রসারণের কার্যকর কাঠামো কিংবা কর ফাঁকি রোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো দেখা যায়নি। ফলে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
বাজেটে করের হার বাড়ানো হয়নি, বরং করের আওতা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি নীতিগতভাবে ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নি¤œ পর্যায়ে রয়েছে। তাই নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, করজাল সম্প্রসারণের নামে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ী, সাধারণ ব্যাংক হিসাবধারী কিংবা নি¤œ-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। বড় করফাঁকিদাতা, অঘোষিত সম্পদের মালিক এবং প্রভাবশালী কর এড়ানো গোষ্ঠীগুলোকে করের আওতায় না এনে শুধু ছোটদের অন্তর্ভুক্ত করা ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
অর্থমন্ত্রী রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য অটোমেশন, ই-রিটার্ন, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং জনবান্ধব কর প্রশাসনের কথা বলেছেন। কিন্তু এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই এখনো পরিকল্পনা বা প্রক্রিয়াধীন পর্যায়ে। বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত না করে শুধু লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দিলে তা শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে, যার ফল হতে পারে করদাতা হয়রানি। দেশের ব্যবসায়ী সমাজও এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছে।
এর চেয়েও বড় উদ্বেগের জায়গা সরকারের ঋণনির্ভরতা। আগামী তিন বছরে সরকারি ঋণের পরিমাণ ৩৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে যে প্রক্ষেপণ দেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়। ঋণ নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা হলো ঋণের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিপরীতে কী ধরনের অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে। যদি ঋণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়ে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করে, তবে তা অর্থনীতির জন্য সহায়ক হতে পারে। কিন্তু যদি ঋণের বড় অংশ পরিচালন ব্যয় ও পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভারী বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং রেয়াতকাল শেষ হওয়া প্রকল্পগুলোর কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। অর্থাৎ নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো ঋণের ভারও ক্রমশ অর্থনীতিকে চেপে ধরবে।
এই বাস্তবতায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ হলো রাজস্ব প্রশাসনের গভীর সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ, করভিত্তি সম্প্রসারণে প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। একই সঙ্গে ঋণের অর্থ যেন উৎপাদনশীল ও আয়বর্ধক খাতে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ঋণ নিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ রাজস্ব আহরণের শক্ত ভিত ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক শাসন। অন্যথায় রাজস্বের মরীচিকা তাড়া করতে গিয়ে দেশকে আরও গভীর ঋণের বেড়াজালে আটকে পড়ার ঝুঁকি নিতে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন