স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের রুদ্রপুর গ্রামের খালধারপাড়া এলাকায়। মাত্র এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা সংস্কারের অভাবে শতাধিক পরিবারের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করছেন। বর্ষা মৌসুমে রাস্তাটি কাদায় পরিণত হওয়ায় অনেকটা গৃহবন্দি জীবনযাপন করতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ বছর ধরে রাস্তাটিতে সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এক কোদাল মাটিও না পড়ায় বর্তমানে রাস্তাটি নর্দমার মতো হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা জমে চলাচল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ফলে কৃষক, শিক্ষার্থী, রোগী, বৃদ্ধ ও শিশুদের প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রুদ্রপুর গাঙধারপাড়ার গোলাম হোসেনের বাড়ির সামনে থেকে খালধারপাড়ার মুকুল হাজির বাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা এলাকার মানুষের একমাত্র চলাচলের পথ। এই রাস্তা দিয়েই স্থানীয় বাসিন্দাদের বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যেতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে রাস্তাটি এখন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। মাঠ থেকে ধান কেটে ঘরে আনতে গিয়ে চরম সমস্যায় পড়ছেন তারা। কাদামাটির কারণে ভ্যান বা অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। অনেক সময় কৃষকদের মাথায় করে বা বিকল্প উপায়ে ফসল ঘরে তুলতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বর্ষাকালে রাস্তাটির বিভিন্ন স্থানে হাঁটুসমান কাদা জমে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে বর্ষার সময় স্কুলে যাওয়া কমিয়ে দেয়। ফলে তাদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রুদ্রপুর মাদিনাতুল ফোরকানিয়া কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মারিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে মাদ্রাসায় যেতে হয়। পা ফেললেই জুতা কাদায় আটকে যায়। অনেক সময় জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। আমরা অনেক কষ্ট করছি। সরকার যেন দ্রুত রাস্তাটি পাকা করে দেয়।’
বিআরডি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু জাফর বলেন, ‘ভাঙা ও কাদাময় রাস্তার কারণে প্রতিদিন স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানো যায় না।’
রুদ্রপুর বিআরডি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, ‘বর্ষা আসলেই শিক্ষার্থীদের স্কুলে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদের হাসপাতালে নিতে বড় সমস্যায় পড়তে হয়। এই রাস্তা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করা সম্ভব হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার আসে-যায়, কিন্তু আমাদের এই সমস্যার সমাধান হয় না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা কষ্টের মধ্যে আছি।’
রুদ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ‘কাঁচা রাস্তার কারণে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। অনেকে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছাতে পারে না।’
স্থানীয়রা জানান, শুধু শিক্ষা ও কৃষি নয়, রাস্তার দুরবস্থার কারণে এলাকার সামাজিক জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি যাতায়াত সমস্যার কারণে অনেক পরিবার মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়ছেন।
গ্রামের বড় মসজিদের মুয়াজ্জিন জিয়ারুল ইসলাম, গাঙধারপাড়ার নুরুল মিয়া, গোলাম হোসেন ও ছোট খোকা হাজিসহ এলাকাবাসী বলেন, ‘নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা রাস্তা সংস্কারের আশ্বাস দেন। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেন না। বহুবার আবেদন করেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।’ তারা আরও বলেন, ‘রাস্তাটি সংস্কার হলে শুধু আমাদের দুর্ভোগই কমবে না, এলাকার কৃষি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও স্বাভাবিক হবে।’
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা প্রকৌশলী সানাউল হক বলেন, ‘রুদ্রপুরের এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কাজের টেন্ডার হয়েছে। বরাদ্দ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হবে।’ দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত রাস্তা সংস্কার ও পাকাকরণের দাবি জানিয়েছেন রুদ্রপুর খালধারপাড়ার বাসিন্দারা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন