× UCB Sticker Card
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:১৫ এএম

খাঁচাবন্দি বেনজীরনামা

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৫:১৫ এএম

খাঁচাবন্দি বেনজীরনামা

এক দেশে এক সম্রাট ছিল। ইতিহাসের পাতায় বেনজীর তিনি। আজ আর কেউ তার নাম মাথা নত করে জপে না। জপলেও কটাক্ষ করে ঘৃণার সঙ্গে জপে, গালির মতো বিড়বিড় করে। ইতিহাসের একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। ক্ষমতায় থাকাকালে নামের আগে-পিছে দশটা উপাধি জুড়ে দেয়, আর পতনের পর শুধু লিখে রাখেÑ ‘একজন অভিযুক্ত, একজন ঘৃণিত, একজন সাবেক প্রভাবশালী ব্যক্তি।’ এই সম্রাটও তেমনই একজন। একসময় তার সামনে মানুষ কথা বলত মেপে মেপে। হাসত হিসাব করে। কাশত অনুমতি নিয়ে। এমনকি অনেকের ধারণা ছিল, সূর্যও নাকি পূর্ব দিক থেকে ওঠার আগে সম্রাটের দপ্তরে আবেদনপত্র পাঠাত। তার ক্ষমতার দিনগুলো ছিল অসাধারণ।

এই বেনজীর সম্রাট যখন রাস্তায় বের হতেন, রাস্তা আগে থেকেই ভয়ে সোজা হয়ে যেত। তিনি যখন বক্তৃতা দিতেন, মাইক্রোফোনও কাঁপত। তিনি যখন চোখ রাঙাতেন, তখন অনেক নিরীহ মানুষও নিজের জন্মসনদ খুঁজতে শুরু করতÑ ‘কোথাও ভুল করেছি নাকি?’ সম্রাটের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, তিনি নিজেকে কখনো ভুল মনে করতেন না।

আবহাওয়া খারাপ? দোষ মেঘের। বেনজীরের নয়। অর্থনীতি খারাপ? দোষ বাজারের। জনগণ অসন্তুষ্ট? দোষ পাবলিকের। শুধু বেনজীর সম্রাটের কোনো দোষ নেই। এমনকি একবার তার দপ্তরের একটি দেয়াল ধসে পড়লে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দিয়েছিল, দেয়ালটি রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত ছিল। রিপোর্ট পড়ে সম্রাট খুব খুশি হয়েছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তাকে বেনজীর স্পেশাল পদক (বিএসএম) দিয়েছিলেন।

কিন্তু পৃথিবীর আরেকটা নিয়ম আছে। যে নিয়ম বইয়ে লেখা থাকে না। সেটা হলো, ক্ষমতা যখন যায়, তখন একা যায় না, সঙ্গে নিয়ে যায় বন্ধু, অনুসারী, প্রশংসাকারী, চামচা, শুভাকাক্সক্ষী,  ফেসবুকের ভক্ত, টক শোর বিশ্লেষকÑ সবাইকে।

এক সকালে ঘুম থেকে উঠে বেনজীর সম্রাট দেখলেন, তার চারপাশটা ফাঁকা। যে লোকটি প্রতিদিন সকালে এসে বলত,  ‘স্যার, আপনার মতো দূরদর্শী মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।’ সে আজ অন্য একজনের অফিসে গিয়ে বলছে, ‘স্যার, আপনার মতো দূরদর্শী মানুষ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।’ শুধু নাম বদলেছে। বাক্য বদলায়নি।

এরপর শুরু হলো মহাবিপর্যয়। সম্রাট একদিন নিজের ফোন বের করলেন। পুরোনো পরিচিতদের ফোন দেবেন। প্রথম নম্বর, ‘এই নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ আছে।’ দ্বিতীয় নম্বর, ‘আপনি ভুল নম্বরে ডায়াল করেছেন।’ তৃতীয় নম্বর, ‘কে বলছেন?’ চতুর্থ নম্বর, ‘দুঃখিত, আমি মিটিংয়ে আছি।’ পঞ্চম নম্বর, ‘আমি বিদেশে।’ ষষ্ঠ নম্বর, ‘আমি এখন আন্ডারগ্রাউন্ড।’ সপ্তম নম্বর, ‘আপনার সঙ্গে আমার কখনো পরিচয় ছিল?’ সম্রাটের চোখ কপালে। তিনি বুঝলেন, স্মৃতিভ্রংশ রোগ আসলে দেশের সবচেয়ে সংক্রামক রোগ।

একদিন সম্রাট বেনজীর খবরের কাগজ খুললেন। যারা একসময় তার প্রশংসা করে কলাম লিখত, তারা এখন লিখছে, ‘আমরা বহু আগেই আশঙ্কা করেছিলাম।’ সম্রাট চিৎকার করে উঠলেন, ‘মিথ্যাবাদী! তোমরাই তো বলেছিলে আমি জাতির ত্রাতা!’ ওপাশ থেকে কাগজ উত্তর দিল না। সংবাদপত্রের একটা সুবিধা হলো, ওরা জবাবদিহি করে না।

দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেনজীর সম্রাট পালিয়ে ছিলেন বিদেশে। অবশেষে স্বর্ণ আর উটের বাণিজ্য করতে এসেছিলেন দুবাই। কপাল খারাপ হলে যা হয় আর কী। সেখানে তিনি ধরা খেলেন। যম ধরা যাকে বলে। তাকে ফিরিয়ে আনা হলো নিজ দেশে। সেখানে তার বিচার হলো। অভিযোগ প্রমাণিত। শাস্তিও হয়েছে। এখন তিনি এক খাঁচাসদৃশ কক্ষে বসে আছেন। লোহার গরাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আর ভাবেন, ‘এত বড় পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত আমার ঠিকানা হলো এই কয়েক হাত জায়গা?’ সেদিন রাতে তিনি এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন, তার অতীতের সব সিদ্ধান্ত মানুষ হয়ে ফিরে এসেছে। একটা সিদ্ধান্ত এসে বলল, ‘আমাকে মনে আছে?’ আরেকটা বলল, ‘আমি সেই অন্যায় আদেশ, যেটাকে আপনি একদিন খুব ছোট ঘটনা ভেবেছিলেন।’ তৃতীয়টা বলল, ‘আমি সেই নির্দোষ মানুষের দীর্ঘশ্বাস।’ চতুর্থটা বলল, ‘আমি সেই মায়ের কান্না, যাকে আপনি গুরুত্ব দেননি।’ পঞ্চমটা বলল, ‘আমি সেই অহংকার, যেটাকে আপনি নেতৃত্ব ভাবতেন।’ সম্রাট ঘামতে ঘামতে উঠে বসলেন। দেখলেন, খাঁচার ভেতর একা তিনি। কিন্তু স্বপ্নের কথাগুলো এখনো কানে বাজছে।

পরদিন এক বৃদ্ধ দার্শনিক তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। দার্শনিক বললেন, ‘কেমন আছেন?’ সম্রাট বললেন, ‘খারাপ। সবাই আমাকে ভুলে গেছে।’ দার্শনিক হেসে বললেন, ‘আপনি ভুল বুঝছেন। মানুষ আপনাকে ভুলে যায়নি। মানুষ আপনাকে মনে রেখেছে বলেই আজ এখানে।’

সম্রাট চুপ। দার্শনিক আবার বললেন, ‘আপনি কি জানেন ক্ষমতা কী? ক্ষমতা হলো ভাড়ার গাড়ি। বেশিক্ষণ নিজের মনে করলে বিপদ।’

এরপর একদিন খাঁচার সামনে একটি সার্কাস বসল। সেখানে শিয়াল, বানর, কাক, পেঁচা সবাই এসেছে। শিয়াল বলল, ‘আমি তো সব সময় নীতির পক্ষে ছিলাম।’ বানর বলল, ‘আমি কখনোই সম্রাটের লোক ছিলাম না।’ কাক বলল, ‘আমার কাছে সব প্রমাণ আছে।’ পেঁচা বলল, ‘প্রমাণ থাকলে এত দিন চুপ ছিলে কেন?’ কাক উত্তর দিল, ‘তখন রাত ছিল না।’ হাসতে হাসতে পুরো সার্কাস লুটোপুটি। শুধু সম্রাটের হাসি পাচ্ছে না। কারণ তিনি বুঝতে শুরু করেছেন, নাটকের সবচেয়ে করুণ চরিত্র কখনো খলনায়ক নয়। সবচেয়ে করুণ চরিত্র হলো সেই ব্যক্তি, যে বিশ্বাস করতে শুরু করেÑ সে কখনো হারবে না।

বছর শেষে ইতিহাসের নতুন বই বের হলো। সেখানে সম্রাটের জন্য মাত্র একটি লাইন লেখা হলোÑ ‘তিনি ক্ষমতাকে স্থায়ী ভেবেছিলেন। সময় তাকে ভুল প্রমাণ করেছে।’ বইয়ের পাতাটা পড়ে বাতাস উল্টে দিল। কারণ ইতিহাসের কাছে কেউই খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। না সম্রাট। না তার অনুসারীরা। না তার স্তুতিগায়করা। সবাই একদিন ফুটনোট হয়ে যায়। শুধু কর্মগুলো থেকে যায়। আর সময়Ñ সে নীরব বিচারকের মতো বসে থাকে। ধীরে ধীরে। নিশ্চুপ। কিন্তু নির্ভুলভাবে।

বেনজীর সম্রাটের ঘুমটা আজকাল আর ঠিকমতো হয় না। আগে তিনি বালিশে মাথা দিলেই ঘুম নেমে আসত। কারণ তখন রাজ্যের সবাই জেগে থাকত ভয়ে। আর এখন উল্টো হয়েছে। রাজ্যের মানুষ নিশ্চিন্তে ঘুমায়, কিন্তু সম্রাটের চোখে ঘুম আসে না।

সম্রাট গত রাতে একটা স্বপ্নে দেখলেন, তিনি আগের মতোই একটা বিশাল সিংহাসনে বসে আছেন। মাথায় সোনার মুকুট, গায়ে রেশমি আলখাল্লা। সামনে লেখাÑ ‘সর্বময় ক্ষমতার শেষ দরবার।’ দরবার শুরু হতেই প্রধান ঘোষক চিৎকার করে বলল, ‘প্রথম মামলার বাদীরা হাজির হোন!’

বেনজীর সম্রাট মহাশয় ভেবেছিলেন কোনো মন্ত্রী আসবে, কোনো আমলা আসবে, অথবা চিরাচরিত কোনো তোষামোদকারী এসে বলবে, ‘জাঁহাপনা, আপনার চাঁদের মতো মুখ দেখে সূর্যও লজ্জা পায়।’ কিন্তু দরজা খুলে ঢুকল কয়েক ডজন আজব আকারের মানুষ। কারো দেহে মাথা নেই, কেউ কাঁধে নিজের মাথা বগলদাবা করে এনেছে। একজন এগিয়ে এসে বলল, ‘মহারাজ, চিনতে পারছেন? পারার কথাও না। শিরñেদের আগে আয়না দেখার সুযোগ দেননি।’ এই কথা শুনে সম্রাট কেঁপে উঠলেন। আরেকজন বলল, ‘আমাকে দেশদ্রোহী বলেছিলেন। পরে জানা গেল আমি শুধু বাজারে আলুর দাম নিয়ে অভিযোগ করেছিলাম।’ তৃতীয়জন বলল, ‘আমি কবিতা লিখেছিলাম। জানতাম না যে, আপনার রাজত্বে কবিতা আর ষড়যন্ত্রের পার্থক্য ছিল খুবই সামান্য।’ দরবারে হাসির রোল উঠল। সম্রাট বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘চুপ! খামোশ। নিরাপত্তারক্ষী কোথায়?’ এক কোণ থেকে উত্তর এলো, ‘আমরা এখানে, জাঁহাপনা।’ সম্রাট দেখলেন, তার সেই ভয়ংকর রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা দাঁড়িয়ে আছে। বেনজীর সম্রাট হুংকার ছুড়লেন, ‘তোমরা ওদের বের করে দাও!’ একজন মাথা নিচু করে বলল, ‘দুঃখিত জাঁহাপনা।’

হঠাৎ দরবারের আলো নিভে গেল। ঘোষকের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল। এবার হাজির হবেন, যাদের ভাগ্যে কোনো কবর জোটেনি, তারা। সম্রাটের বুক ধক্ করে উঠল। দেখলেন, অসংখ্য ছায়ামূর্তি এগিয়ে আসছে। কাউকেই পুরো দেখা যায় না, কেউ কুয়াশার মতো। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল এক ছোট মেয়ে। সে সম্রাটকে বলল, ‘আমার নাম অপেক্ষা। আমি সেই মেয়ে, যে প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে বাবার ফেরার অপেক্ষা করতাম। এখনো করি। ডান পাশে আমার ছোট বোন, ওর নাম প্রতীক্ষা। সে অপেক্ষা করে বাবা চকোলেট নিয়ে ফিরবে। পুতুলও আনতে পারে।’ অপেক্ষার বাঁ পাশে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আরেক শিশু। ওর নাম প্রশ্ন। প্রশ্ন চিৎকার করে ওঠে, ‘আমার বাবা কোথায়?’ সম্রাট উত্তর খুঁজলেন। পেলেন না।

দরবারে এরপর ঢুকলেন কয়েকজন স্ত্রী। কেউ সাদা শাড়ি পরে আছেন, কেউ এখনো স্বামীর পুরোনো ছবি বুকে চেপে রেখেছেন। একজন বললেন, ‘আপনি আমাদের বলেছিলেনÑ সব ঠিক আছে।’ আরেকজন বললেন, ‘আপনি বলেছিলেনÑ খোঁজ চলছে।’ তৃতীয়জন হেসে বললেন, ‘এত খোঁজাখুঁজি করেও কাউকে পাওয়া গেল না। কিন্তু ইতিহাস খুব সহজেই আপনাকে খুঁজে পেয়েছে। তা সেটা দুবাইতেই হোক। খুঁজে তো পেয়েছে।’ সম্রাট তখন ঘামছেন। তিনি চিৎকার করে বললেনÑ ‘এটা ষড়যন্ত্র!’

সঙ্গে সঙ্গে দরবারে প্রবেশ করল এক অদ্ভুত চরিত্র। নিজের পরিচয় দিল, ‘আমি বাস্তবতা। অনেক বছর আমাকে দরবারে ঢুকতে দেননি। আজ আমন্ত্রণ ছাড়াই এসেছি।’ এরপর আরেকজন ঢুকল। পিঠে বিশাল হিসাবের খাতা। বললেন, ‘আমি কর্মফল বিভাগের প্রধান হিসাবরক্ষক। আপনার দেওয়া প্রতিটি আদেশ, প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি মিথ্যা, প্রতিটি ভয় দেখানো, প্রতিটি তোষামোদÑ সব কিছুর হিসাবের খাতা নিয়ে এসেছি।’  সম্রাট কাঁপা গলায় বললেন, ‘এত বড় খাতা!’ লোকটি উত্তর দিল, ‘জাঁহাপনা, এটা শুধু প্রথম খ-। আরও ১৫ খ- আছে।’

শেষে দরবারে প্রবেশ করল সবচেয়ে ভয়ংকর এক চরিত্র। তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কোনো সৈন্য নেই। শুধু একটি আয়না ধরে আছে। লোকটি হাসল। পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমি ইতিহাস।’

আয়নাটা বেনজীর সম্রাটের সামনে ধরতেই তিনি দেখলেন, সিংহাসনে বসে আছেন ঠিকই, কিন্তু মাথায় আজ আর মুকুট নেই। পোশাকের দুই কাঁধেও কোনো প্রতীক নেই। চিৎকার করে উঠলেন বেনজীর সম্রাট। চমকে ঘুম ভাঙল। দেখলেন, তার চারপাশে কেউ নেই। তবু যেন মনে হলো, ঘরের অন্ধকারে কোথাও থেকে একটি কণ্ঠে আরবি শব্দস্রোত ভেসে আসছে, ‘লা তাসরুখ আইয়ুহাল ওয়াগদ। হাজি লাইসাত মাহকামাতুক। হাজি মাহকামাহ। তাজাক্কার, মাহকামাতুত তারিখ মাফতুহাহ দায়িমান।’ এর বাংলা অর্থ, ‘চিৎকার করো না, হে বদমাশ! এটি তোমার আদালত নয়। এটি আসল আদালত। মনে রেখো, ইতিহাসের আদালত সব সময় খোলা থাকে।’

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!