যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা প্রশমনে আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সইয়ের কথা রয়েছে। তবে চুক্তির ঘোষণা বিশ^বাজারে স্বস্তি ফেরালেও এর বাস্তবায়ন, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও পারমাণবিক ইস্যুর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও কাতারের সহায়তায় দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে একমত হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে এই চুক্তির কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা চলবে এবং শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং এর ফলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবারও জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি। অন্যদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবালয় জানিয়েছে, সমঝোতার আওতায় লেবাননসহ সব যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তির আগে অপরপক্ষকে প্রাথমিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খসড়া চুক্তিতে মোট ১৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদের একটি অংশ অবমুক্ত করা। তবে সবচেয়ে জটিল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার জন্য বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না এবং ভবিষ্যৎ সমঝোতায় তা যাচাইযোগ্য ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে, ইরান জোর দিচ্ছে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের যাচাইয়ের ওপর।
এই চুক্তির খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জাতিসংঘ এই উদ্যোগকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশও যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ^ অর্থনীতিতেও এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ পুনরায় চালুর সম্ভাবনায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে এবং এশিয়ার বিভিন্ন শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা দিলেই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। যুদ্ধের কারণে আটকে থাকা জাহাজের জট নিরসন, নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিমা-সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে এই সমঝোতা নিঃসন্দেহে বড় অগ্রগতি হলেও এখন নজর থাকবে শুক্রবারের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী ৬০ দিনের আলোচনার দিকে। কারণ কাগজে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও আঞ্চলিক আস্থা পুনর্গঠন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন