উপার্জন কেবল জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে না, বরং মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যখন একজন পুরুষ তার নারী সঙ্গীর চেয়ে কম আয় করেন বা পুরোপুরি গৃহস্থালির কাজে মনোনিবেশ করেন, তখন তা তাদের আত্মমর্যাদায় বড় ধরনের আঘাত হানে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সামাজিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা বিষণœতা ও পারিবারিক কলহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে সমাজে পুরুষকে পরিবারের মূল উপার্জনকারী বা ‘অন্নদাতা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে উঠেছে। তবে বর্তমান বিশে^ এই চিত্র দ্রুত পাল্টাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান হারে নারীরা পুরুষ সঙ্গীর চেয়ে বেশি আয় করছেন। এই পরিবর্তন পরিবার ও সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সুইডেনে ১০ বছরের আয়ের তথ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো পরিবারে স্ত্রী তার স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখন পুরুষদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি প্রায় ১১ শতাংশ বেড়ে যায়।
ডারহাম ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডেমিড গেটিক এই বিষয়ে জানান, বর্তমানে সমাজে সরাসরি মুখে না বলা হলেও পুরুষদের বেশি আয় করার সামাজিক প্রত্যাশা এখনো প্রবল। যখন এই প্রত্যাশা পূরণ হয় না, তখন পুরুষরা একধরনের ক্ষমতাহীনতায় ভোগেন, যা তাদের জীবন ও সম্পর্কের প্রতি অসন্তুষ্টি বাড়িয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক সময় পুরুষরা তাদের ক্ষুণœ হওয়া পুরুষত্ব বা আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের জন্য ভিন্ন পথ বেছে নেন, যা বিবাহবিচ্ছেদের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
মেলবোর্নের মোনাশ ইউনিভার্সিটির গবেষক কার্লা এলিয়ট মনে করেন, এই মানসিক সংকট থেকে উত্তরণের একটি বড় উপায় হলো পুরুষত্বের প্রচলিত সংজ্ঞা পরিবর্তন করা। বর্তমানে ‘কেয়ারিং ম্যাসকুলিনিটি’ বা ‘সেবামূলক পুরুষত্ব’ ধারণার বিকাশ ঘটছে, যেখানে পুরুষরা কেবল অর্থ উপার্জন নয়, বরং পরিবারের যতœ, সহানুভূতি ও গৃহস্থালির কাজে অংশ নেওয়াকে পুরুষত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক রূপান্তরকে সহজ করতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার পরিবর্তন প্রয়োজন, যেমন পুরুষদের জন্য বাধ্যতামূলক পিতৃত্বকালীন ছুটি (প্যাটার্নিটি লিভ) চালু করা। সুইডেনের মতো দেশগুলোয় এই নীতি সফল হয়েছে, যা পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার পাশাপাশি নারীদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে। শেষ পর্যন্ত, অর্থনৈতিক এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা এবং পুরুষদের গৃহস্থালির কাজে উৎসাহিত করার মাধ্যমেই কেবল সমাজে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন