মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ১৫ কোটি টাকার সম্প্রসারিত প্রশাসনিক ভবন ও হলরুমের নির্মাণকাজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের মধ্যকার জমিসংক্রান্ত বিরোধ আর সমন্বয়হীনতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে ছয়তলাবিশিষ্ট এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এর ফলে একদিকে যেমন উপজেলা পরিষদের স্থাবর সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে তীব্র স্থান সংকটে সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও দাপ্তরিক কাজে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ২৪ নভেম্বর উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় এই ভবন নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া যায়। উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ নকশা অনুযায়ী বর্তমান পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার গোডাউন এলাকায় ভবনটি নির্মাণের প্রস্তাব করে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ও পিআইও অফিস জায়গার প্রয়োজনে সরে যেতে রাজি হলেও আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)।
বিআরডিবি কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রস্তাবিত জমিটি ইউসিসিএর (উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি) নামে বরাদ্দ। তখন বিআরডিবির মহাপরিচালক ড. সরদার মো. কেরামত আলী জেলা প্রশাসককে দেওয়া এক চিঠিতে জানান, ২০১৫ সালের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিআরডিবির কোনো স্থাপনা ভাঙতে হলে সংশ্লিষ্ট পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক।
অন্যদিকে, উপজেলা প্রশাসনের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭৮ সালের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী জমিটি ইউসিসিএকে ব্যবহার করতে দেওয়া হলেও এর মালিকানা হস্তান্তর করা হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন জানান, শর্ত অনুযায়ী ইউসিসিএ জমি ব্যবহারের জন্য কোনো ভাড়াই পরিশোধ করেনি। তা ছাড়া বর্তমান রেকর্ড অনুযায়ী জমির মালিকানা এখনো উপজেলা পরিষদের নামেই রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।
এদিকে ভবন নির্মাণের জন্য সয়েল টেস্ট, টপোগ্রাফিক সার্ভে এবং মাস্টারপ্ল্যান সম্পন্ন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখান থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন আসে। এর পরই গত ১৭ ফেব্রুয়ারি উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো অপসারণের চিঠি দেয়। কিন্তু বিআরডিবি সদর দপ্তরের আপত্তিতে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
বিআরডিবি কর্মকর্তাদের মতে, তারা উন্নয়নের বিরোধী নন, তবে বিধি অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা সরানো সম্ভব নয়। উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শিরিন আক্তার দাবি করেন, এর আগে অন্য স্থানে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, যা এখন পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিকল্প কোনো উপযুক্ত জায়গা উপজেলা চত্বরে অবশিষ্ট নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিআরডিবির যে গোডাউনটি নিয়ে এত জটিলতা, সেটি গত কয়েক বছর ধরে মাসিক ২০ হাজার টাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। সরকারি স্থাপনা এভাবে বেসরকারি খাতে ভাড়া দেওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের মতে, নিজেরা কাজ না করে এবং ভবনটি পরিত্যক্ত রেখে সরকারি জায়গা দখল করে রাখা এবং নতুন উন্নয়নের বিরোধিতা করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়ায় উপজেলা পরিষদে বর্তমানে তিল ধারণের জায়গা নেই। বিভিন্ন দপ্তরের ফাইল ও আসবাবপত্র বারান্দায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ বসার জায়গা পান না, বৃষ্টির দিনে ভোগান্তি পৌঁছায় চরমে।
সচেতন মহল মনে করছে, দুই প্রভাবশালী বিভাগের এই সমন্বয়হীনতার কারণে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায় বরাদ্দ হওয়া ১৫ কোটি টাকার প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে এই বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘এটি উপজেলা পরিষদের নিজস্ব জমি। নতুন ভবন হলে বিআরডিবিসহ সব দপ্তরই আধুনিক অফিস স্পেস পাবে। অথচ একগুঁয়েমির কারণে সরকারি অর্থ ও জনস্বার্থ দুই-ই ব্যাহত হচ্ছে।’
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা গত ১৩ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠির মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসনে দিকনির্দেশনা চেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন জমি অধিগ্রহণ করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ, যা প্রকল্পের ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত নেই। তাই বর্তমান জায়গাতেই ভবন হওয়া একমাত্র যৌক্তিক সমাধান।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন