ফুটবল বিশ্বকাপের ক্যানভাসে প্রতি চার বছর পরপর যেমন নতুন তারকার জন্ম হয়, তেমনই কিছু চেনা মুখ চিরতরে হারিয়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য যতটা আনন্দের, ঠিক ততটাই সুপ্ত বেদনার। কারণ, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি ও প্রভাবশালী একটি প্রজন্মের বেশ কয়েকজন অবিসংবাদিত নায়কের জন্য এটাই ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। মাঠে তাদের শেষবারের মতো দৌড়ানো, শেষবারের মতো জার্সির লোগোটা চেপে ধরা আর গ্যালারির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ার প্রতিটি ফ্রেম যেন একেকটি জীবন্ত নস্টালজিয়া। লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর চিরন্তন দ্বৈরথের শেষ অধ্যায়, নেইমারের শৈল্পিক ফুটবলের চূড়ান্ত গন্তব্য, কিংবা লুকা মদ্রিচ ও কেভিন ডি ব্রুইনার মতো মগজশাসিত মিডফিল্ডারদের বিদায়, ফুটবল বিশ্ব যেন এক যুগান্তকারী রূপান্তরের সাক্ষী হচ্ছে।
লিওনেল মেসি
২০২২ সালের কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে লিওনেল মেসি ফুটবলীয় অমরত্ব লাভ করেছিলেন। অনেক ফুটবল বিশ্লেষকই ভেবেছিলেন, সেই মহাকাব্যিক সমাপ্তির পর হয়তো আর কখনো বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে না এই জাদুকরকে। কিন্তু ফুটবলের প্রতি তীব্র ভালোবাসা আর ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার জার্সির টানে ২০২৬ আসরেও তিনি মাঠে নেমেছেন। তবে বাস্তবতার নির্মম সমীকরণ বলে, ৩৯ বছর বয়সি মেসির জন্য এটাই শেষ বিশ্বকাপ। মাঠে এখন আর মেসির সেই তরুণ বয়সের গতি নেই, কিন্তু তার প্রজ্ঞা প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরায়। এবার আলবিসেলেস্তে সমর্থকরা মাঠে আসছেন ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পায়ের জাদু শেষবারের মতো চোখ ভরে দেখে নিতে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গোলমেশিন এবং ইস্পাতকঠিন মানসিকতার প্রতীক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৪১ বছর বয়সে এসেও নিজের শারীরিক সক্ষমতাকে যে স্তরে ধরে রেখেছেন, তা আধুনিক বিজ্ঞান ও ক্রীড়াজজগতের জন্য পরম বিস্ময়। পর্তুগালের হয়ে তার এই ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলাটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আসলে তার ক্যারিয়ারের দীর্ঘ লড়াই ও অপরাজিত চরিত্রের চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ। ইউরোপের ক্লাব ফুটবল ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর পরও দেশের জন্য রোনালদোর ক্ষুধা বিন্দুমাত্র কমেনি। ডাগআউটে বসে থাকা বা মাঠে শুরুর একাদশে থাকা নিয়ে হাজারো বিতর্কের মাঝেও পর্তুগিজ জার্সিতে সিআরসেভেনের উপস্থিতি গ্যালারিতে অন্যরকম বিদ্যুতায়িত পরিবেশ তৈরি করে। বক্সের ভেতর তার সেই চিরচেনা লাফানো, এরিয়াল ডমিনেন্স আর গোলের পর ‘সিউউউ’ উল্লাসের শেষ অধ্যায়টি দেখার জন্য ফুটবলবিশ্ব অধীর। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার শেষ বিশ্বকাপ যাত্রা পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়।
নেইমার জুনিয়র
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের চিরায়ত শৈলী জোঁগা বোনিতো, যার মূল কথা হলো মাঠে ফুটবল নিয়ে আনন্দ করা, ড্রিবলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বোকা বানানো এবং শিল্পের ছোঁয়া রাখা। সেই হারিয়ে যাওয়া সাম্বা ফুটবলের শেষ খাঁটি প্রতিনিধি হয়ে গত দেড় দশক ধরে সেলেসাওদের টেনে নিয়ে চলেছেন নেইমার জুনিয়র। ৩৪ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ডের ক্যারিয়ারজুড়ে রয়েছে ইনজুরির নির্মম অভিশাপ। কিন্তু শত আঘাত, অস্ত্রোপচার ও সমালোচনার দেওয়াল ভেঙে নেইমার আরও একবার ফিরে এসেছেন হলুদ জার্সির ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে ওড়াতে।
পেলেকে ছাড়িয়ে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করলেও, নেইমারের ট্রফি ক্যাবিনেটে একটি সোনালি বিশ্বকাপের অভাব আজও রয়ে গেছে। তার গতি কিছুটা কমলেও ফাইনাল থার্ডে তার ড্রিবলিং, ক্ষুরধার অ্যাসিস্ট এবং ফ্রি-কিকের জাদু এখনো অনন্য। সেলেসাও সমর্থকদের জন্য এই বিশ্বকাপ তাদের প্রিয় ১০ নম্বর জাদুকরের শেষ লড়াই। নেইমারের কান্নার ফ্রেমগুলো অনেক দেখেছে ফুটবলবিশ্ব, এবার সবাই চায় এই ফুটবল রাজপুত্রের মুখে একটা হাসি দেখতে।
লুকা মদ্রিচ
মেসি-রোনালদো-নেইমারের আক্রমণাত্মক ফুটবলীয় ঝড়ের সমান্তরালে ফুটবলকে যিনি মগজ ও শিল্পের এক অনুপম স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন, সে মিডফিল্ডারও এবার তার বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে। ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তান লুকা মদ্রিচ। ৪০ ছুঁইছুঁই বয়সেও ক্রোয়েশিয়ার মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ তার পায়ে। ২০১৮ সালের রানার্সআপ এবং ২০২২ সালের সেমিফাইনালের রূপকথা লেখা এই ক্রোয়াট অধিনায়কের আউটসাইড-অব-দ্য-ফুট পাসিং হয়তো আর কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যাবে না।
কেভিন ডি ব্রুইনা
অন্যদিকে, বেলজিয়ামের গোল্ডেন জেনারেশন বা সোনালি প্রজন্মের শেষ সলতে হয়ে জ্বলছেন কেভিন ডি ব্রুইনা। ৩৫ বছর বয়সি এই মিডফিল্ড মাস্টারের ডিফেন্স-ছেঁড়া পাস এবং দূরপাল্লার শট বহু বছর ধরে প্রিমিয়ার লিগ ও বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়েছে। বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের অন্য সতীর্থরা একে একে বিদায় নিলেও ডি ব্রুইনা একাই টেনে নিয়ে চলেছেন রেড ডেভিলসদের। এই মিডফিল্ডারের বিদায় মূলত মাঝমাঠের একটি ধ্রুপদি ও শিল্পনির্ভর যুগের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটাচ্ছে।
প্রজন্মের ব্যাটন বদল
ফুটবল ম্যাচ বা টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মাঠে রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে সমর্থকের মনে। জুড বেলিংহাম, কিলিয়ান এমবাপ্পে বা ল্যামিন ইয়ামালদের মতো তরুণ তুর্কিরা হয়তো আগামী দশক বিশ্বফুটবল শাসন করবেন, কিন্তু মেসি-রোনালদো-নেইমারদের তৈরি করা শূন্যস্থানটি পূরণ হতে অনেক সময় লাগবে। গত দুই দশক ধরে এই তারকারা আমাদের রাতগুলোকে রঙিন করেছেন, করপোরেট ফুটবল আর পিআর যুদ্ধের যুগেও মােেঠর খাঁটি ফুটবলীয় রোমাঞ্চ টিকিয়ে রেখেছেন। নকআউট পর্বের যেকোনো ম্যাচেই এই তারকাদের যেকোনো একজনের দল হেরে যাওয়া মানেই, বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে তার চিরদিনের মতো বিদায়। এই বিদায়ের করুণ সুর টুর্নামেন্টের আবহকে ভারি করে তুললেও, ফুটবলপ্রেমীরা জানেন যে তারা একটি ঐতিহাসিক যুগের সাক্ষী ছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন