মহররম মাসের ১০ তারিখ বা আশুরা মুসলিম উম্মাহর কাছে এক বিশেষ তাৎপর্যের দিন। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে তৈরি হয়েছে অনেক ভিত্তিহীন কাহিনি, যা লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে ধর্মীয় বিশ্বাসের রূপ নিয়েছে। বিশুদ্ধ হাদিস ও ইসলামি ফিকহের আলোকে এই কাহিনিগুলো পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
প্রচলিত কাহিনি : কতটুকু প্রমাণিত
গ্রামীণ জনপদে ও প্রচলিত কিছু বইয়ে
আশুরাকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘ তালিকা
পাওয়া যায় এই দিনে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছে, নুহ (আ.)-এর কিশতি জুদি পাহাড়ে ভিড়েছে, ইব্রাহিম (আ.) অগ্নিকু- থেকে মুক্তি পেয়েছেন, এমনকি এই দিনেই কেয়ামত হবে।
বিশুদ্ধ হাদিস ও প্রামাণিক ফিকহের কিতাবে এই তালিকার অধিকাংশ ঘটনার সপক্ষে গ্রহণযোগ্য সূত্র নেই। এগুলোর বেশির ভাগই হয় ‘ইসরায়েলি রেওয়াতÑ অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিষ্টান লোকগাথা থেকে আসা বিবরণ, অথবা পরবর্তীকালে তৈরি হওয়া অতিরঞ্জিত কাহিনি। (মোল্লা আলি কারি, আল-আসরারুল মারফুআ ফিল আখবারিল মাওযুআ, ১/২৯৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৬)।
পবিত্র কোরআন যেকোনো তথ্যের উৎস যাচাইয়ের নির্দেশ দেয় (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)। সেই মানদ-ে এই কাহিনিগুলো টেকে না।
আশুরার প্রামাণিক ইতিহাস
আশুরার দিনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রামাণিক ঘটনাটি হলোÑ বনি ইসরাইলের মুক্তি। নবী মুসা (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে মিশরের অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে পালাচ্ছিলেন। সামনে লোহিত সাগর, পেছনে ফেরাউনের সেনাবাহিনী। আল্লাহর নির্দেশে সাগরে পথ তৈরি হয়, বনি ইসরায়েল পার হয়ে যায়, আর ফেরাউন সৈন্যসহ ডুবে মারা যায়।
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন ইহুদিরা ১০ মহররম রোজা রাখছে। কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ নবী মুসা ও তাঁর কওমকে উদ্ধার করেছিলেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়েছিলেন; তাই নবী মুসা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন।
নবীজি বললেন, মুসার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং তিনিও রোজা রাখলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪৩)। এই ঘটনাটি আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য স্পষ্ট করে : জুলুমের বিরুদ্ধে হকের বিজয় ও আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
প্রাক্?-ইসলামি আরবে আশুরা
ইসলামের আগেও কোরাইশরা আশুরার দিনে কাবায় নতুন গিলাফ চড়াত এবং রোজা রাখত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৯২)।
মহররম ইসলামে চারটি সম্মানিত মাসের একটি (সুরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩৬)। তাই এই মাসের এবং বিশেষত আশুরার প্রতি প্রাক্?-ইসলামি আরবে একটি সামাজিক সমীহ ছিল। ইসলাম এই পবিত্রতাকে স্বীকৃতি দিয়ে তাওহিদের ভিত্তিতে পুনর্গঠিত করেছে।
সুন্নাহ অনুযায়ী আশুরার ইবাদত
আশুরার একমাত্র সুন্নাহসম্মত ইবাদত হলোÑ রোজা। ইহুদিদের সঙ্গে বাহ্যিক মিল এড়াতে মহানবী (সা.) ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম একসঙ্গে দুটি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)।
আমাদের সমাজে আশুরাকে কেন্দ্র করে যে মাতম সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে শরীর রক্তাক্ত করা, কালো কাপড় পরা, বিশেষ খাবার রান্নাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করাÑ এর কোনো ভিত্তি বিশুদ্ধ হাদিসে নেই। বরং শোকে বুক চাপড়ানো ও মাতম করার সংস্কৃতিকে মহানবী (সা.) নিষিদ্ধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৯৪)।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন