বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর শুরু হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সফরটিকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীন সফরকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা কেবল দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, অবকাঠামোগত অগ্রগতি এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার প্রশ্নের সঙ্গেও এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, অ্যাকশন প্ল্যান ও প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংখ্যার বিচারে এটি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। তবে যেকোনো আন্তর্জাতিক সফরের সাফল্য চুক্তির সংখ্যায় নয়, বরং সেসব চুক্তির বাস্তবায়ন, কার্যকারিতা এবং জাতীয় উন্নয়নে তার বাস্তব অবদানের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, শিল্প খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ দেশের অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে। এই বাস্তবতায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো সময়ের দাবি। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে অন্যতম শীর্ষ শক্তি। ফলে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর হলে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন অভিযাত্রায় নতুন গতি পেতে পারে।
বিশেষত যোগাযোগ অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্মার্ট শিল্পায়ন, বন্দর উন্নয়ন ও লজিস্টিকস খাতে সহযোগিতার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনীতি দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন এবং উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্পে যে দেশ যত দ্রুত এগোতে পারবে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় সে দেশ তত এগিয়ে থাকবে। বাংলাদেশের জন্য তাই শুধু অর্থায়ন নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।
সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় তিস্তা মহাপরিকল্পনা। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশার নাম। তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, নদীভাঙন এবং কৃষি উৎপাদনের নানা সমস্যা এ অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে আসছে। বহু বছর ধরে তিস্তা নিয়ে নানা আলোচনা হলেও কার্যকর অগ্রগতি খুব বেশি হয়নি। এবারও বিষয়টি আলোচনায় আসছে। সরকার জানিয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
চীন সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ সামার দাভোস ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন বাংলাদেশের জন্য নিজেকে বিনিয়োগবান্ধব গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে তাই প্রত্যাশা অনেক। তবে সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত বাস্তব অর্জন। নতুন ঋণ নয়, প্রয়োজন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা। সফর শেষে কতগুলো চুক্তি সই হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হবেÑ বাংলাদেশ কী পেল, দেশের মানুষ কী পেল এবং দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল কতটা টেকসই হবে।
আমরা আশা করি, মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন