দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে সরকার। বিগত সময়ের নানা অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে উঠে নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এই লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজও শুরু করেছে। সূত্রমতে, প্রশাসন ও পুলিশের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক রদবদল, যোগ্য ও পেশাদার কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন এবং মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়াতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে পুরো ব্যবস্থা।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, যেকোনো মূল্যে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনাই এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
সরকারের পঞ্চমুখী কৌশল
সরকার কেবল গতানুগতিক পন্থায় নয়, বরং আধুনিক ও যুগোপযোগী কিছু কৌশল নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি বিষয় হলো- পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পদায়ন, বিগত দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় কোণঠাসা হয়ে থাকা দক্ষ, সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া।
দ্রুত সাড়াদান ব্যবস্থা, দেশের যেকোনো প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে বা কোনো সহিংসতা দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তা দমনের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন। তাছাড়া গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা। এর লক্ষ্য অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে অপরাধ যাতে ঘটতে না পারে, এমন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উইংগুলোকে আরও সক্রিয় রাখা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রমতে, দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, র্যাব ও প্রয়োজনে অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনায় জোর দেওয়া হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশিং ও জবাবদিহি ব্যবস্থার পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনতে উদ্যোগী সরকার। একই সঙ্গে বাহিনীর ভেতরে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম সহ্য না করার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা হবে
পুলিশ বাহিনী পুনর্গঠন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব বিষয়ে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, ‘পুলিশের প্রধান কাজই হচ্ছে জনগণের জানমালের হেফাজত করা। পুলিশ জনগণের শত্রু নয়, বন্ধু- এই বিশ্বাস আমাদের। দেশে অনেকটা শান্তি-শৃঙ্খলা এসেছে; কিন্তু আবারও শক্তভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা বাহিনীর প্রতিটি স্তরে সংস্কার শুরু করেছি। মাঠপর্যায়ে থানাগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি সক্রিয় এবং সেখানে সেবার মান বাড়াতে কঠোর মনিটরিং করা হচ্ছে, যাতে সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে যদি নাগরিক হয়রানি, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণ হয়, তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আমরা একটি আধুনিক, চৌকস ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি এবং খুব দ্রুতই দেশের মানুষ এর সুফল দেখতে পাবেন।’
প্রশাসনে দক্ষ কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার হিড়িক
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পদায়ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিতর্কিত ও নিষ্ক্রিয় কর্মকর্তাদের ওএসডি (ওভারডিউ ডিউটি) করা বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, একটি গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা। এই প্রশাসনিক সংস্কার ও মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সচিব এবং মাঠপর্যায়ের একজন বিভাগীয় কমিশনার।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন সিনিয়র সচিব জানান, ‘প্রশাসনের প্রাণশক্তি হলো নিরপেক্ষতা ও গতিশীলতা। বিগত কয়েক বছরে প্রশাসনের চেন অব কমান্ড মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমরা যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের সঠিক স্থানে পদায়ন করে চেন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনার কাজ করছি। জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, সততা এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য একটাই- জনগণ যেন কোনো সরকারি দপ্তরে এসে অযথা হয়রানির শিকার না হন এবং সরকারি সেবা যেন দ্রুত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়।’
এসব বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা জানান, ‘মাঠপর্যায়ে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাই আমাদের মূল কাজ। আমরা জেলার ডিসি ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সভা করছি। স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। আমরা আশাবাদী, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুব দ্রুতই মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’
জনমনে স্বস্তি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
সরকারের এসব নানামুখী তৎপরতা ও কঠোর অবস্থানের কারণে এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতির উন্নত হতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান জোরদার হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রশাসনিক জড়তা ও বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার এবং তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়ে জনগণের আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়া রাতারাতি সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর মনিটরিং। সরকার যদি তাদের এই নিরপেক্ষ ও কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তবে দেশ খুব দ্রুত একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিকরা।
কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট ভাষায় তার অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা একটি ক্রান্তিকাল পেরিয়ে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। আমাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ হলো দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিগত দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার কারণে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। আমরা সেই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করছি। এখন থেকে পুলিশ বা কোনো বাহিনী কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ করবে না, তারা কাজ করবে জনগণের সুরক্ষায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। সে যে দলেরই হোক না কেন, আইন অমান্য করলে বা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করলে, তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। মাঠ প্রশাসনকে আমরা পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি, যাতে তারা নির্ভয়ে কাজ করতে পারে। কোনো ধরনের তদবির বা রাজনৈতিক চাপ বরদাশত করা হবে না।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন