প্রায় তিন শতকের ইতিহাসের সাক্ষী সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের তালুকগাঁও গ্রামের রাধামাধব জিউর আখড়া আজ অস্তিত্বের সংকটে। একসময় শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টা ও নামসংকীর্তনের ধ্বনিতে মুখরিত থাকা এই প্রাচীন বৈষ্ণব উপাসনালয় বর্তমানে অবহেলা, অযতœ ও দীর্ঘদিনের সংস্কারহীনতায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ভক্ত ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
স্থানীয়ভাবে ‘রাধামাধবের আখড়া’ বা ‘ইসকন মন্দির’ নামে পরিচিত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থানীয়দের বিশ্বাস অনুযায়ী প্রায় ৩০০ বছর আগে বৈষ্ণব সাধিকা জানকী মা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১১০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত আখড়াটি দীর্ঘদিন ধরে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের উপাসনা, সাধনা ও ধর্মীয় কর্মকা-ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
প্রতি বছর ঝুলনযাত্রা, রথযাত্রা, দোলপূর্ণিমাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এখানে। এসব উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকায় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আখড়ার মূল ভবনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং অধিকাংশ দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। ছাদের একাধিক অংশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে রাধামাধবের বিগ্রহসহ মূল্যবান ধর্মীয় সামগ্রী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে মূল ভবনে পূজা-অর্চনা ও নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) আখড়াটির ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শতবর্ষী এই স্থাপনার সংস্কার সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঐতিহাসিক ও প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এখনো আখড়াটিকে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনার তালিকাভুক্ত করা হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনের অবকাঠামো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি ভবনের ভেতরে প্রবেশ করায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়ছে। জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবনটির বড় অংশ ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আখড়া পরিদর্শনে আসা ভক্ত সুম বিশ্বাস বলেন, ‘এটি শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। তিন শতকের এই ঐতিহ্য রক্ষায় দ্রুত সরকারি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে বঞ্চিত হবে।’
এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসলাম উদ্দিন বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
ঐতিহ্যবাহী এই আখড়াটি সংরক্ষণে স্থানীয় বাসিন্দা, ভক্ত ও সচেতন মহল দ্রুত প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে রাধামাধব জিউর আখড়া শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও পর্যটন ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন