শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম, একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন এখন নতুন রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীর বিক্ষোভ, সংসদ অভিমুখে মিছিলের চেষ্টা, পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা এবং কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল একটি ছাত্র আন্দোলন, নাকি ধীরে ধীরে বৃহত্তর জনআন্দোলনের দিকে এগোচ্ছে?
সোমবার (২০ জুলাই) সংসদ অভিমুখে মিছিলের চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। তাদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। তবে আন্দোলনের বিস্তৃত পরিসরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধেও স্লোগান ওঠে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে আন্দোলনকারীরা সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন।
বিক্ষোভকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে পুলিশের লাঠিচার্জের দৃশ্য প্রচারিত হলেও দিল্লি পুলিশ বলপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সময়ে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সাময়িকভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়। ভারত সরকারের এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনার সঙ্গে তুলনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট ও মোবাইল ডেটা পরিষেবা বন্ধ, কারফিউ এবং ব্যাপক সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরে সেই আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
এ কারণেই ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, ছাত্রদের আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধের মতো পদক্ষেপ জনমনে আরও প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কেবল এই মিলের ভিত্তিতে ভারতের পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ঘটনার সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক বাস্তবতা, আন্দোলনের চরিত্র এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্রচারণা থেকে গড়ে ওঠা সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সংগঠনটির দাবি, সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিজেপি বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
সংসদের অধিবেশন শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আন্দোলন নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে ভারতের তরুণদের সাফল্য এবং মহাকাশ কর্মসূচির অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তারা সরকারের প্রশংসা নয়; শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের সমাধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা চান।
এরই মধ্যে পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনায় আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিরোধী দলগুলোও শিক্ষা সংকটের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যান্য ইস্যু সামনে এনে সরকারকে চাপে রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের চলমান আন্দোলনকে এখনই ‘গণঅভ্যুত্থান’ বলা যাবে না। তবে ছাত্রদের দাবি যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ছাত্র আন্দোলনই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে ভারতের ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিণতি হবে কি না, তা নির্ভর করবে আন্দোলনের বিস্তার, জনসমর্থন এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন