ঢাকা রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

স্বপ্নের দেশে শঙ্কার ছায়া

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২৬, ০৬:৩৯ এএম

একসময় বিদেশে পাড়ি জমানো মানেই ছিল স্বপ্নের নতুন দিগন্ত। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের আশায় লাখো বাংলাদেশি ছুটেছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। কিন্তু আজ সেই স্বপ্নের পথজুড়ে জমেছে ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ, ইউরোপে কঠোর অভিবাসননীতি, উত্তর আমেরিকায় শরণার্থী ও কর্মসংস্থানের বিধি-নিষেধ, আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী সহিংসতাÑ সব মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা এখন এক অস্থির সময় পার করছেন। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও উদ্বেগ পিছু ছাড়ছে না। আর যাদের অবস্থান অনিশ্চিত, তাদের কাছে প্রতিটি দিন যেন নতুন পরীক্ষার নাম।

যুদ্ধের ছায়ায় উপসাগরীয় প্রবাসীরা : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে প্রবাসীদের মধ্যে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বলছেন, বাহ্যিকভাবে জীবন স্বাভাবিক মনে হলেও মানুষের মনে ভয় বাসা বেঁধেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর নিয়মিত পৌঁছাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে শঙ্কা : যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের জন্য নতুন উদ্বেগের নাম কর্মসংস্থান অনুমতি হারানোর আশঙ্কা। প্রস্তাবিত নতুন নীতির আওতায় মানবিক সুবিধাভোগী, বিশেষ প্রশাসনিক সুরক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং বহিষ্কারের আদেশের মুখোমুখি থাকা অনেক অভিবাসীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

বহিষ্কারের আতঙ্ক : যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কাগজপত্রবিহীন বাংলাদেশিদের মধ্যে ভয় আরও প্রকট হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে কয়েক দফায় বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও কয়েকশ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে আলোচনা চলছে। এর ফলে অনেকে কর্মস্থলে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, কেউ আইনজীবীর শরণাপন্ন হচ্ছেন, আবার কেউ দেশে ফেরার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন।

কানাডায় স্বপ্নভঙ্গের শঙ্কা : অভিবাসনবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত কানাডাও এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। নতুন আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমা অতিক্রমের পর শরণার্থী আবেদন গ্রহণ না করার বিধান চালু হয়েছে। এতে হাজার হাজার আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ফ্রান্সে বৈধ অভিবাসনেও অনিশ্চয়তা : ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। সেখানে বৈধ অভিবাসনে সাময়িক বিরতির প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। যদি তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কর্মভিসা, পারিবারিক পুনর্মিলনসহ নিয়মিত অভিবাসনের পথও সংকুচিত হতে পারে। অনেক বাংলাদেশি জানিয়েছেন, আবাসন নবায়ন, সাক্ষাৎকার এবং কাগজপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় দীর্ঘ ও জটিল হয়ে উঠেছে।

ইউরোপে নতুন অভিবাসন বাস্তবতা : ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন অভিবাসন ও শরণার্থীনীতি কার্যকর করেছে। নতুন ব্যবস্থায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার, দ্রুত আশ্রয় প্রক্রিয়া এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার সমাধান করবে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এর ফলে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার আরও সংকুচিত হতে পারে।

যুক্তরাজ্যে আতঙ্কের নতুন নাম : যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক সহিংসতা নতুন করে অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। উগ্র ডানপন্থিদের হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং অভিবাসীবিরোধী স্লোগানে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বহু প্রবাসী। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে কয়েকটি বাংলাদেশি পরিবার সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। প্রবাসীরা বলছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকলেও এখন নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না।

কেয়ার ভিসার ফাঁদে নিঃস্ব মানুষ : যুক্তরাজ্যে কেয়ার খাতে কাজের আশায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন বহু বাংলাদেশি। চাকরি, বাসস্থান ও স্থায়ী আয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালালচক্র বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশিবিরোধী ক্ষোভ : দক্ষিণ আফ্রিকায় অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বকে কেন্দ্র করে বিদেশিবিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে। অবৈধ অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার আলটিমেটাম এবং বিভিন্ন আন্দোলনের জেরে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। বৈধভাবে বসবাসরত প্রবাসীরাও নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। অনেক বিদেশি নাগরিক আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

ফিনল্যান্ডে বাড়ছে প্রত্যাবাসন : উত্তর ইউরোপের দেশ ফিনল্যান্ডও অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর হার বেড়েছে। নথিবিহীন অভিবাসীদের মধ্যে ভয় ও মানসিক চাপ বাড়ছে। অনেকে বলছেন, নিজ দেশে ফিরে গেলে তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। তবুও আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে ফেরত যাওয়ার চাপ তৈরি হচ্ছে।

ভূমধ্যসাগর : স্বপ্নের পথে মৃত্যুফাঁদ : উন্নত জীবনের আশায় বিপজ্জনক সমুদ্রপথে যাত্রা করা অভিবাসীদের জন্য ভূমধ্যসাগর এখনো এক নির্মম বাস্তবতা। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় শত শত মানুষের নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নারী ও শিশুসহ বহু মানুষের ভাগ্য এখনো অজানা। প্রতিবছর উন্নত জীবনের স্বপ্নে মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়ালেও অনেকের যাত্রা শেষ হয় অচেনা জলরাশিতে।

অনিশ্চয়তার প্রহর গুনছে প্রবাসজীবন : বিশ্বজুড়ে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান অভিবাসনকে নতুন এক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।

যে প্রবাসজীবন একসময় ছিল আশার প্রতীক, আজ সেখানে যুক্ত হয়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার দীর্ঘ ছায়া। তবুও জীবনের তাগিদে মানুষ স্বপ্ন দেখা থামায় না। প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর আকাক্সক্ষা নিয়েই হাজারো বাংলাদেশি এখনো বিদেশের মাটিতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তাদের একটাই প্রত্যাশাÑ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, ন্যায়সংগত নীতি এবং নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা। কারণ প্রবাসীদের কাছে বিদেশ মানে শুধু কর্মস্থল নয়; সেটিই তাদের স্বপ্ন, দায়িত্ব এবং বেঁচে থাকার অবলম্বন।