বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার অপরাধ এবং অনলাইন প্রতারণা বিশ্বব্যাপী এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মেসেজিং অ্যাপগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতারক চক্র প্রতিনিয়ত তাদের জাল বিস্তার করছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে মেটা তাদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত করছে একটি অত্যাধুনিক ‘স্ক্যাম অ্যালার্ট’ ফিচার।
নিচে এই ফিচারের কার্যকারিতা, প্রযুক্তিগত দিক এবং প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলোÑ
হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্য কেন হোয়াটসঅ্যাপ?
সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে হোয়াটসঅ্যাপ এখন সাইবার অপরাধীদের প্রথম লক্ষ্য বা সফট টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
ছদ্মবেশী আক্রমণ : প্রতারকরা বিভিন্ন নামী ব্যাংক, নামী কুরিয়ার সার্ভিস বা সরকারি সংস্থার ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে মেসেজ পাঠায়।
বিপজ্জনক লিঙ্ক : লটারি জেতা, আকর্ষণীয় চাকরির অফার বা জরুরি অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের অজুহাতে ক্ষতিকর লিঙ্ক পাঠানো হয়।
ডেটা চুরির ঝুঁকি : ব্যবহারকারীরা কোনো কিছু না বুঝে এই লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করলেই ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে হ্যাকারদের হাতে, যার ফলে ব্যক্তিগত ছবি, পাসওয়ার্ড এবং ব্যাংকিং তথ্য বেহাত হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে।
চ্যাটের ভেতরেই স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা বার্তা
এই নতুন ফিচারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি ব্যবহারকারীকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই সতর্ক করে দেবে।
অজ্ঞাত নম্বর স্ক্রিনিং : আপনার কন্টাক্ট লিস্টে নেই এমন কোনো অজ্ঞাত নম্বর থেকে মেসেজ বা লিঙ্ক এলে হোয়াটসঅ্যাপের এআই সিস্টেম সেটি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করবে।
অন-স্ক্রিন অ্যালার্ট : মেসেজটি ক্ষতিকর বা সন্দেহজনক মনে হওয়া মাত্রই চ্যাট বক্সের ভেতরে একটি লাল বা বিশেষ সতর্কতামূলক পপ-আপ বার্তা ভেসে উঠবে। সেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবেÑ ‘এই মেসেজটি প্রতারণার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।’
সহজ প্রতিরোধব্যবস্থা : এই সতর্কবার্তা দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহারকারী চাইলে এক ক্লিকেই ওই নম্বরটিকে ‘ব্লক’ এবং মেটার নিরাপত্তা টিমের কাছে ‘রিপোর্ট’ করতে পারবেন।
ডিভাইসের ভেতরেই ডেটা প্রসেসিং (শতভাগ গোপনীয়তা)
সাধারণত যেকোনো মেসেজ বা তথ্য যাচাই করতে তা মূল সার্ভারে পাঠাতে হয়, যা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মনে গোপনীয়তা ভঙ্গের ভয় থাকে। মেটা এই ফিচারে সেই সমস্যার সমাধান করেছেÑ
অন-ডিভাইস টেকনোলজি : স্ক্যাম অ্যালার্ট ফিচারটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহারকারীর নিজস্ব স্মার্টফোনের (গেজেট) ভেতরেই কাজ করবে।
সার্ভার-মুক্ত যাচাইকরণ : কোনো মেসেজ ক্ষতিকর কি না তা পরীক্ষা করার জন্য সেটি হোয়াটসঅ্যাপ বা মেটার কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠানো হবে না। ফলে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত চ্যাটের গোপনীয়তার শর্ত বা অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড এনক্রিপশন পলিসি কোনোভাবেই লঙ্ঘিত হবে না।
‘লোকাল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট’ কী?
স্ক্যাম অ্যালার্টের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের জন্য আরও একটি সহায়ক ফিচার নিয়ে কাজ করছে, যার নাম ‘লোকাল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট’।
নিরাপত্তার খতিয়ান : এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী একটি নির্দিষ্ট সময়ে তার অ্যাকাউন্টে কতবার এবং কখন এই স্ক্যাম অ্যালার্টটি সক্রিয় হয়েছিল তার একটি সম্পূর্ণ হিসাব বা লগ দেখতে পারবেন।
ডিভাইসেই সংরক্ষণ : এই রিপোর্টের সব তথ্য শুধু ব্যবহারকারীর ফোনেই সংরক্ষিত থাকবে, বাইরের কেউ এটি দেখতে পাবে না।
বর্তমান অবস্থা ও ব্যবহারকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি
হোয়াটসঅ্যাপে আসা প্রতিনিয়ত স্প্যাম এবং ফিশিং মেসেজ বন্ধের জন্য গ্রাহকরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী ইন-বিল্ট ফিচারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিচারটি বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারীর জন্য পরীক্ষামূলক (ইবঃধ ঠবৎংরড়হ) ধাপে রয়েছে। মেটা এর কার্যকারিতা এবং বাগ ফিক্সিংয়ের কাজ শেষ করলেই আগামী বৈশ্বিক আপডেটের মাধ্যমে এটি সব সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

