× UCB Sticker Card
সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৫:৫০ এএম

শান্তির হাতছানি, তবু অনিশ্চয়তার ছায়া

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২৬, ০৫:৫০ এএম

শান্তির হাতছানি, তবু অনিশ্চয়তার ছায়া

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত যেন শেষ হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী সূত্রের ভাষ্যÑ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু যুদ্ধের শেষ অধ্যায়ে এসেও অনিশ্চয়তা কাটছে না। কারণ, সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের আশাবাদ, অন্যদিকে তেহরানের সতর্কতা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তার জন্মদিনে অর্থাৎ রোববারই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও জানিয়েছেন, একটি ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু ইরানের অবস্থান অনেক বেশি সতর্ক। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেছেন, রোববার চুক্তি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়; তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে।

চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি : সম্ভাব্য এই সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের সময় ইরান কার্যত এই পথের ওপর নিয়ন্ত্রণ কড়াকড়ি করে বিশ্ববাজারে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং তেল রপ্তানির ওপর থাকা কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। এ ছাড়া ইরানের আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ অবমুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই চুক্তিতে কোনো অর্থের লেনদেন হবে না। কিন্তু ইরান বরাবরই বলছে, জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়া সমঝোতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মূল মতবিরোধ : সমঝোতার সবচেয়ে জটিল অংশ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করা এবং দেশটির পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া। অন্যদিকে ইরানের অবস্থান ভিন্ন। তেহরান চায়, তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো অক্ষুণœ রেখে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পুরোপুরি ধ্বংস না করে তা কম মাত্রায় রূপান্তর করে দেশের ভেতরেই সংরক্ষণের পক্ষে তারা। এই বিরোধের সমাধানের জন্য ষাট দিনের বিশেষ আলোচনার প্রস্তাব রয়েছে খসড়া চুক্তিতে।

চুক্তির বিরুদ্ধে ইরানের ভেতরেই বিক্ষোভ : সমঝোতার সম্ভাবনা যতই জোরালো হচ্ছে, ততই প্রকাশ্যে আসছে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। দেশটির কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো মনে করছে, এই চুক্তি ইরানের কৌশলগত স্বার্থকে দুর্বল করবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যে প্রভাব তেহরান দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে এসেছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, আলোচকদল যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছে। কিছু বিক্ষোভে আরাগচির পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে। এমনকি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে মতৈক্য নেই।

যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল নয়, বরং আরও কঠোর করেছে : এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ইরানকে দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিলÑ পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা, আঞ্চলিক প্রভাব কমানো এবং প্রয়োজনে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো।

কিন্তু কয়েক মাস পর চিত্রটি ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ ইরানকে বরং আরও সামরিককেন্দ্রিক ও কৌশলগতভাবে কঠোর করে তুলেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ইসলামিক রিপাবলিকের নতুন অধ্যায়’ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়েছে।

ট্রাম্পের স্থল অভিযান থামানোর সিদ্ধান্ত : চলমান আলোচনার আড়ালে আরেকটি নাটকীয় তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল করতে স্থল অভিযান চালানোর পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে এ নিয়ে জরুরি বৈঠকও হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযানটি স্থগিত করেন। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কয়েকটি বিষয়Ñ বিপুল মার্কিন প্রাণহানির আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকি। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের আশঙ্কা ছিল, সরাসরি হামলা হলে ইরান শুধু হরমুজ নয়, ইয়েমেনের মিত্রগোষ্ঠীর মাধ্যমে বাব-আল-মান্দাব প্রণালিও অচল করে দিতে পারে। এতে বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

ইসরায়েলের অস্বস্তি : সম্ভাব্য এই চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে রয়েছে ইসরায়েল। দেশটির সরকার জানিয়েছে, তারা এই সমঝোতার অংশ নয়। বরং তাদের আশঙ্কা, ওয়াশিংটন তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত মেনে নিয়েছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এমন চুক্তি ভবিষ্যতে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন, আঞ্চলিক প্রভাব এবং পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়ে যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়নি। ফলে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যেও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

কূটনীতির শেষ দৌড় : সমঝোতা চূড়ান্ত করতে কাতারের প্রতিনিধিরাও তেহরানে পৌঁছেছেন। বিভিন্ন সূত্র বলছে, শেষ মুহূর্তের জটিলতা কাটিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরির চেষ্টা চলছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার সমঝোতার খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এবারও চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।

সামনে কী অপেক্ষা করছে : যদি এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে সহিংসতা কমার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তবে মূল প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছেÑ ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কী হবে? জব্দ সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি কীভাবে নিষ্পত্তি হবে? প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা, এই সমঝোতা কি স্থায়ী শান্তির পথ খুলে দেবে, নাকি এটি হবে দীর্ঘস্থায়ী ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ অবস্থার আরেকটি অধ্যায়? মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ এখন সেই উত্তর জানার অপেক্ষায়। যুদ্ধের ক্লান্তি পেরিয়ে শান্তির সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অবিশ্বাস, কৌশলগত হিসাব-নিকাশ এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো সেই পথকে কাঁটাযুক্ত করে রেখেছে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!