× UCB Sticker Card
বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ০৫:১৫ এএম

বদলে গেছে পুরো অঞ্চলের শক্তির সমীকরণ

শান্তির পথে আস্থার সংকট

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ১৭, ২০২৬, ০৫:১৫ এএম

শান্তির পথে আস্থার সংকট

প্রায় চার মাস ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধ, অগণিত প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া অবকাঠামো এবং বিশ^ অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দেওয়া উত্তেজনার পর অবশেষে এক অন্তর্বর্তী সমঝোতার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকা এই সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যে স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়ে গেছে গভীর অনিশ্চয়তা। সমঝোতার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ইরানের পুনর্গঠনে প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এটি কোনো সরকারি অনুদান নয়; বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে গঠিত হবে। তবে এই অর্থ পেতে হলে তেহরানকে শান্তি চুক্তি ও পরমাণু কর্মসূচি-সংক্রান্ত সব শর্ত মেনে চলতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা অর্থ ছাড় একবারে হবে না। ধাপে ধাপে অগ্রগতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত ইরানের কাছে এক ডলারও পৌঁছায়নি বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।

যুদ্ধবিরতি থেকে শান্তির পথে : সমঝোতা স্মারকের আওতায় বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিশে^র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই প্রণালি দিয়ে সাধারণ সময়ে বিশে^র প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের সময় এটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ^ জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সার সরবরাহেও বিঘœ ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ করা হবে। সমুদ্রের নিচে পাতা মাইন অপসারণের কাজও চলছে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের নতুন হিসাব : আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ইরানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। এমনকি মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে প্রায় ৯ কোটি মানুষের বিশাল বাজার এবং বিপুল জ্বালানি সম্পদ বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই তহবিলের কাঠামো, পরিচালনা পদ্ধতি এবং অর্থ ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত রূপ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

পরমাণু কর্মসূচিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের আবার ইরানে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংসের বিষয়েও আলোচনা এগোবে। অন্যদিকে ইরান বলছে, দ্বিতীয় ধাপের আলোচনায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হবে। উভয়পক্ষই আপাতত কঠিন বিষয়গুলো ভবিষ্যতের জন্য তুলে রেখেছে। ফলে বর্তমান সমঝোতাকে পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তির চেয়ে সংঘাত নিয়ন্ত্রণের একটি অন্তর্বর্তী কাঠামো বলেই বেশি মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

যুদ্ধের হিসাব-নিকাশে ভুল : বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ভুল মূল্যায়নের ভিত্তিতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ধারণা করেছিল, ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়বে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই কাক্সিক্ষত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বরং যুদ্ধের ধাক্কা সামলে তেহরানের ক্ষমতাকাঠামো আরও শক্তভাবে সংগঠিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সরকারের পতন ঘটেনি। বরং নতুন নেতৃত্ব এবং সামরিক কাঠামো দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে ওঠে এবং প্রত্যাশিত দ্রুত বিজয় অধরাই থেকে যায়।

বিশ^ অর্থনীতিতে ধাক্কা : হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। দরিদ্র দেশগুলোয় খাদ্য নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি কাজে ব্যবহৃত সার এবং শিল্প উৎপাদনের কাঁচামাল পরিবহনে বিঘœ ঘটায় এর প্রভাব বহু দেশের অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ^জুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপও বেড়ে যায়। সেই প্রেক্ষাপটে প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগকে বিশ^ অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলের অস্বস্তি : যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ অংশীদার থাকলেও সমঝোতা প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলকে কার্যত প্রান্তিক অবস্থানে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

হোয়াইট হাউসেও মতভেদ : চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরেও একমত অবস্থান নেই। গোয়েন্দা সংস্থার কিছু শীর্ষ কর্মকর্তা ইরানের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, তেহরান শেষপর্যন্ত সব শর্ত বাস্তবায়ন করবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

যুদ্ধোত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাস্তবতা : এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রেও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান নতুন করে বিবেচনা করছে। কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভর না করে আঞ্চলিক ভারসাম্যের নতুন পথ খোঁজার আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা আস্থার সংকট : যুদ্ধবিরতি, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট এখনো গভীর। চুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। পরমাণু কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এবং লেবানন প্রশ্নে মতপার্থক্য বহাল রয়েছে।

ফলে এই সমঝোতা স্থায়ী শান্তির ভিত্তি হবে, নাকি সাময়িক বিরতির পর আবারো সংঘাত ফিরে আসবেÑ তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এত রক্তপাত, ধ্বংস আর বৈশি^ক অস্থিরতার পর মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ অন্তত কিছুটা স্বস্তির নিশ^াস ফেলতে শুরু করেছে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তারা এখন অপেক্ষা করছেÑ এই সমঝোতা কি সত্যিই শান্তির নতুন অধ্যায় রচনা করবে, নাকি ইতিহাসের আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকবে।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!