রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের মূল কেন্দ্র ছিল ইউক্রেনের ভূখ-। কিন্তু এখন যুদ্ধের প্রভাব ক্রমেই রাশিয়ার অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। ইউক্রেন শুধু সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, বরং রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিল্প-কারখানা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং কৌশলগত স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। একই সঙ্গে রাশিয়াও ইউক্রেনজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করেছে। পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধবন্দি বিনিময়, ইউরোপে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং এশিয়ার আকাশসীমায় সামরিক তৎপরতাÑ সব মিলিয়ে যুদ্ধ এখন আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা কারখানায় ইউক্রেনের দূরপাল্লার আঘাত : ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়ার ভলগোগ্রাদ অঞ্চলে অবস্থিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শিল্প-কারখানা ‘টাইটান-বারিকাডি’-তে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার ‘ফ্লেমিঙ্গো’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পরিচালিত এই হামলায় কারখানার ভেতরে বড় ধরনের অগ্নিকা-ের সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এই কারখানায় ভারী কামান, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা, কৌশলগত অস্ত্রের লঞ্চার এবং বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা হয়। ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যেই এসব সামরিক স্থাপনায় ধারাবাহিকভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে ভলগোগ্রাদ অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই বোচারভ স্বীকার করেছেন, রাতে উচ্চগতির অস্ত্রের আঘাতে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তিনি কারখানার নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর দাবি, হামলায় অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন এবং দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
তেল পাম্পিং স্টেশনেও ড্রোন হামলা : সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে ইউক্রেন। দেশটির নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, ভ্লাদিমির অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ‘ভতোরোভো’ তেল পাম্পিং স্টেশনে আবারও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। চলতি মাসে এটি ওই স্থাপনায় দ্বিতীয় হামলা। এই কেন্দ্রটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদেশে তেল রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিচালনার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতেই ইউক্রেন এখন জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জেলেনস্কির ভাষায়, রাশিয়ার অভ্যন্তরে এই ধারাবাহিক চাপ শেষ পর্যন্ত ন্যায়সংগত ও মর্যাদাপূর্ণ শান্তির ভিত্তি তৈরি করবে।
রাশিয়ার দাবি, এক রাতেই শত শত ড্রোন ভূপাতিত : ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়া জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এক রাতেই ৬৬০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এক রাতে এত বিপুলসংখ্যক ড্রোন প্রতিহত করার দাবি এটিই প্রথম। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানী মস্কো, ক্রিমিয়া, কৃষ্ণসাগর, আজভ সাগর এবং একাধিক অঞ্চলের আকাশে এসব ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, রাজধানীমুখী অন্তত ৪৭টি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে। অন্যদিকে তুলা অঞ্চলে ড্রোন হামলায় একটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একজন নারী আহত হয়েছেন।
ক্রিমিয়ায় জরুরি অবস্থা : রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। সেভাস্তোপলের রুশ-নিযুক্ত প্রশাসন জানিয়েছে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কাজ চলছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহার সীমিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যক্তিগত যানবাহনে জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং গণপরিবহন ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ক্রিমিয়ার প্রশাসনের মতে, জরুরি অবস্থা ঘোষণার উদ্দেশ্য হলোÑ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা।
ইউক্রেনেও অব্যাহত রুশ হামলা : রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ছে। রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পোলতাভা ও খারকিভ অঞ্চলে তাদের একাধিক উৎপাদনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহে রাশিয়া প্রায় ১ হাজার ৪০০টি ড্রোন এবং ১৯টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করা এবং মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ড্রোন সহযোগিতা বৃদ্ধি করা এখন ইউক্রেনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এদিকে নিকোপোল শহরে রুশ ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত এবং অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। পৃথক হামলায় সুমি অঞ্চলেও একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধবন্দি বিনিময়ে মানবিক অগ্রগতি : তীব্র সংঘাতের মধ্যেও মানবিক উদ্যোগ হিসেবে আরও একটি বড় যুদ্ধবন্দি বিনিময় সম্পন্ন করেছে রাশিয়া ও ইউক্রেন। দুই দেশই ১৬০ জন করে মোট ৩২০ জন যুদ্ধবন্দিকে নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি ইউক্রেনীয় বন্দি দেশে ফিরেছেন। শুধু চলতি বছরেই মুক্তি পেয়েছেন প্রায় দেড় হাজারের বেশি সেনাসদস্য। রাশিয়াও জানিয়েছে, মুক্ত হওয়া তাদের সেনারা বর্তমানে বেলারুশে অবস্থান করছেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা পাচ্ছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এখন ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেও নতুন করে নাড়া দিচ্ছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, ইউক্রেনে চাপের মুখে থাকা রাশিয়া ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করতে বাল্টিক অঞ্চল বা পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে সীমিত মাত্রার উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এশিয়ার আকাশেও সামরিক উত্তেজনা : যুদ্ধের সরাসরি অংশ না হলেও পূর্ব এশিয়াতেও নতুন সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, চীন ও রাশিয়ার ১০টিরও বেশি সামরিক বিমান দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে।
যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা : রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তের লড়াই নয়; এটি সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বহুমাত্রিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে যুদ্ধের ভারসাম্য বদলানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়িয়ে চলেছে। একই সময়ে ইউরোপে নিরাপত্তা উদ্বেগ, পূর্ব এশিয়ায় সামরিক তৎপরতা এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক স্পষ্ট করে দিচ্ছেÑ এই যুদ্ধ আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রতিটি নতুন ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে এবং বিশ্বকে ক্রমশ আরও অনিশ্চিত এক বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

