ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

দ্বিমুখী সংকটে এশিয়ার ধানভান্ডার

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০১:২৮ এএম

বিশ্ব জুড়ে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে এশিয়ার কৃষি খাতের সামনে একসঙ্গে দেখা দিয়েছে দুটি বড় সংকট। একদিকে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অন্যদিকে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ধানচাষ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশে^র অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই পরিস্থিতি শুধু কৃষকদের নয়, খাদ্যবাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ধান উৎপাদনে প্রকৃতির কঠিন পরীক্ষা : ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ভারতসহ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে এল নিনোর প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা নেই, আবার কোথাও বর্ষা স্বাভাবিক সময়ে না আসায় ধানের চারা রোপণ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় কৃষকেরা সময়মতো আবাদ শুরু করতে পারছেন না। এতে শুধু চলতি মৌসুম নয়, আগামী মাসগুলোর খাদ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ব্যয় বাড়ছে, কমছে কৃষকের সক্ষমতা : আবহাওয়ার প্রতিকূলতার পাশাপাশি কৃষকদের সামনে আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন ব্যয়। আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় সেচ কিংবা সার ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে ফসলের গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধির সময়েও অনেক জমিতে যথাযথ পরিচর্যা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কম বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের বাড়তি খরচ এবং সারের ব্যবহার কমে যাওয়াÑ এই তিনটি কারণ একত্রে ধানের উৎপাদনের জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

বাজারে বাড়ছে দামের চাপ : উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। এশিয়ার অন্যতম মানদ- হিসেবে বিবেচিত থাইল্যান্ডের রপ্তানি চালের দাম গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারেও চালের দাম দ্রুত বাড়ছে। সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ক্রেতারা আগেভাগেই মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছেন, যা মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

উৎপাদন কমার আশঙ্কা : বিশ্বের কৃষিবিষয়ক সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বৈশ্বিক ধান উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে মজুতের পরিমাণও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এশিয়াজুড়ে বাড়ছে ঝুঁকি : ভিয়েতনামে লক্ষাধিক হেক্টর ধানখেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও সম্ভাব্য ফলন হ্রাস নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিÑ সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থাই চাপে পড়েছে। এর সঙ্গে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি যোগ হওয়ায় অনেক দেশের অর্থনীতিও নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে।

ক্ষুদ্র কৃষকের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি : বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর প্রতিটি নেতিবাচক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ক্ষুদ্র কৃষকদের। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, সেচ ব্যয় বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে তাদের আয় হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে এই সংকট শুধু কৃষি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

আগাম প্রস্তুতির তাগিদ : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এল নিনো আরও শক্তিশালী হলে আগামী এক থেকে দেড় বছর ধানের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। তাই এখন থেকেই খরা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, পানি সাশ্রয়ী কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের জন্য সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এল নিনো কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; এটি প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। তবে এর প্রভাব কেবল সমুদ্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধারা বদলে দিয়ে এটি বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আবহাওয়াগত সংকট সৃষ্টি করে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে।

বৈশি^ক কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় বাড়ছে উদ্বেগ : বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মৎস্যসম্পদও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়বে এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়বে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশেও বাড়ছে প্রভাবের আশঙ্কা : বাংলাদেশও এই বৈশি^ক পরিবর্তনের বাইরে নয়। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এল নিনোর কারণে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বর্ষাকালে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে খরার ঝুঁকি, নদ-নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং কৃষিতে সেচের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।