ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

ষাটোর্ধ্ব অফেজার আর্তনাদ

আটবার বাড়ি ভাঙল, জানি না আর কতবার হারাতে হবে

রেজাউল করিম মানিক, ডিমলা থেকে ফিরে
প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ০২:১৬ এএম

‘জানি না কতবার ঘর হারালে সরকার আমাদের জন্য একটা স্থায়ী বাঁধ দেবে। বিয়ের পর যখন এই বাড়িতে এসেছিলাম, তখন আমাদের ঘর ছিল তিস্তা নদীর মাঝামাঝি। একে একে সব শেষ হয়ে গেছে। আটবার আমাদের ঘর ভেঙেছে। জানি না আর কতবার ঘর হারালে সরকার আমাদের জন্য একটা স্থায়ী বাঁধ দেবে।’

কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারী হয়ে চোখের কোণে অশ্রু জমে ষাটোর্ধ্ব অফেজা বেগমের। পেছনে তিস্তা নদীর গর্জন, সামনে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। যে উঠানে বসে তিনি স্মৃতিচারণা করছিলেন, সেই উঠানের অর্ধেকটা এরই মধ্যে তিস্তায় বিলীন হয়ে গেছে।

অফেজা বেগম নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি ইউনিয়নের পশ্চিম ছাতুনামা গ্রামের কেল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্বামী তোয়াল উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিস্তার ভাঙনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলছেন। কিন্তু সেই যুদ্ধে জয় মেলেনি কখনো। নদী বারবার কেড়ে নিয়েছে তাদের ঘর, আঙিনা, ফসলি জমি, গাছপালা, স্মৃতি আর স্বপ্ন।

অফেজা বেগমের মতো এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে কেল্লাপাড়া ও আশপাশের এলাকায়। তাদের জীবন যেন নদীর স্রোতের সঙ্গে বাঁধা। বছরের পর বছর ভাঙন-আতঙ্কে দিন কাটে। বর্ষা এলেই তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখেন। রাতে ঘুম ভাঙলেই আতঙ্কিত হয়ে শোনেন নদীর গর্জন। কখনো মাঝরাতে ঘর খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। আবার কখনো চোখের সামনেই নদীতে হারিয়ে যায় বসতভিটা, সহায়-সম্বল।

কয়েক দিন আগে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সে সময় নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছিল বসতভিটায়। এখন তিস্তার পানি কমতে শুরু করলেও নতুন আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভাঙন। সরেজমিন দেখা যায়, এরই মধ্যে সেখানে প্রায় পাঁচটি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। কেউ কেউ দ্রুত ঘরবাড়ি সরিয়ে নিয়েছে। আবার কেউ আশ্রয় নিয়েছে নিরাপদ স্থানে। অনেকের বাড়ির সামনে চলে এসেছে ভাঙন। কারো বা উঠান গেছে, বাড়িটি আছে বিলীনের অপেক্ষায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক দিনে অনেকের বাড়িতেই চুলা জ্বলেনি। নদীর মতিগতির দিকে লক্ষ রাখতে গিয়ে শুকনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন তারা। এমন বৈরী পরিবেশে এই এলাকার বাসিন্দারা ভুগছেন নিরাপদ খাবার পানি, চিকিৎসা ও খাদ্যসংকটে। কেল্লাপাড়া এলাকার অনেকে, যাদের অন্যত্র জমি আছে, তারা নদী থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছেন ঘরবাড়ি। আর যাদের জমি নেই, তারা ভাঙন এলাকা থেকে একটু দূরে তুলছেন নতুন ঘর। 

অসহায় অফেজা বেগম  বলেন, ‘বিয়ের পর যে বাড়িতে এসেছি, সেটি ছিল নদী থেকে অনেক দূরে। সেখানে ছিল টিনের ঘর, ফলের বাগান, চাষের জমি আর সচ্ছলতার স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার গতিপথ বদলাতে থাকে। শুরু হয় নদীভাঙন। প্রথমে কিছু জমি, পরে বসতভিটা যায় নদীতে। অন্যত্র নতুন করে বাঁচার চেষ্টা শুরু করি। কিন্তু ভাঙনের করালগ্রাস থেকে মুক্তি মেলেনি। নতুন ঘর তোলার পর প্রতিবার ভেবেছি, এবার হয়তো আর ভাঙবে না। কিন্তু বর্ষা এলেই বুক ধড়ফড় করে। কখন নদী এসে ঘর নিয়ে যায়Ñ সেই ভয় নিয়েই বেঁচে আছি। আটবার ঘর সরিয়েছি, এখন আর সরানোর জায়গাও নেই।’

এই এলাকার আরেক বাসিন্দা আমেনা বেগম  বলেন, ‘তিস্তা আমাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমরা যারা তিস্তাপাড়ে থাকি, আমাদের কষ্টের শেষ নেই। বর্ষাকাল এলেই আমাদের রাতে ঘুম হয় না। এখানে আমরা যারা আছি, কোনো ধরনের ত্রাণ চাই না। আমরা চাই, সরকার আমাদের স্থায়ী বাঁধ করে দিক। আমাদের ঘরবাড়ি অনেকবার ভেঙেছে। আবার বর্ষা এসেছে, আবার সেই আতঙ্কÑ কখন জানি ঘর ভাঙে।’

আবু তালেব বলেন, ‘আমরা যারা এখানে বাস করি, তারা অসংখ্যবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবিÑ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হোক।’ একই দাবি শোনা যায় রহিমা বেগমের কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো বেশি কিছু চাই না। শুধু এমন একটা বাঁধ চাই, যাতে অন্তত বাকি জীবনটা নিশ্চিন্তে কাটাতে পারি। বারবার ঘর বানানোর শক্তি আর নেই।’

এ বিষয়ে ডিমলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘তিস্তাতীরের কোনো স্থানে ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনরক্ষায় কাজ করা হয়। কেল্লাপাড়া এলাকায় ভাঙন রক্ষায় প্রায় ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।’

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেলে পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা হয়।’