ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী জুলাই বিপ্লবী শহিদ শরিফ ওসমান গনি বিন হাদি হত্যার নেপথ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টা আছে কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রধানের ভাষ্য, ব্যক্তিগত কারণে ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে, এমন তথ্য এখন পর্যন্ত তদন্তে আসেনি। তাই মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক কারণেই ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। এদিকে মামলার তদন্তে পুলিশ দুই কিলার ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল ও তার সহযোগী আলমগীর শেখের অবস্থান নিয়ে পুরোনো সুর শুনিয়েছে পুলিশ। তারা ভারতে পালিয়ে গেছে- এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। পুলিশের ভাষ্য, দুই আসামির ভারতে পালিয়ে যাওয়ার যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে সেটি কৌশলগতও হতে পারে।
এদিকে ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম এবং তার সহযোগী আলমগীর খানকে গ্রেপ্তারের অগ্রগতি জানাতে সরকারকে সময় বেঁধে দেয় হাদির হাতে গড়া সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। দাবি করা হয়েছে, অগ্রগতি না হলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর পদত্যাগ চাওয়া হবে। এর পরই গতকাল সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়। সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, মূল খুনি ফয়সাল ও আলমগীর শেখ কোথায় আছেন তারা তা জানেন না। তবে তদন্তে অগ্রগতি রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওসমান হাদির মামলার তদন্তে তালগোল পাকাচ্ছে। ওসমান হাদিকে হত্যার কারণ উদঘাটন তো দূরের কথা, নেপথ্যে হত্যার পরিকল্পনাকারী কারা ছিল তার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও শ্যুটার ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল ও তার সহযোগী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আলমগীর শেখ এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। তাদের দুজনের শেষ অবস্থান সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই, যা এ মামলার তদন্তে পুলিশের অসহায় অবস্থা ফুটে উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা ফয়সালের শেষ অবস্থান নিয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এটা পেতে আমাদের গোয়েন্দা ও তদন্তকারী অফিসাররা নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকা মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন রাত ৯টায় আসামির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপরই তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু হয়। হাদি হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল সন্দেহভাজনদের অবস্থান শনাক্তে তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রাথমিকভাবে হত্যাকাণ্ডের ধারণা হচ্ছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে। এখানে ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে হয়নি। ঘটনার শুরু থেকে আমরা মাঠে ছিলাম। সব এজেন্সি সমন্বিতভাবে কাজ করছি। এটা আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে সম্ভাব্য সব দিক দেখছি। এর আগে ডিবি-প্রধান শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমে বলেন, ‘ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও মোটরসাইকেল আমরা ইতিমধ্যেই উদ্ধার করেছি। আটককৃত সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
খুনিদের অবস্থান ও তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়ে বিবৃতি ইনকিলাব মঞ্চের
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির ওপর গুলিবর্ষণকারী, হামলার পরিকল্পনা ও সহায়তাকারীদের গ্রেপ্তারসহ দুই দফা দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ। এ বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো স্পষ্ট করে জানতে চেয়েছে তারা। গতকাল রোববার বিকেলে এক প্রেস বিবৃতিতে এসব দাবি জানায় ইনকিলাব মঞ্চ।
বিবৃতিতে বলা হয়, শহিদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারী, খুনে সহায়তাকারী, পলায়নে সহযোগী এবং আশ্রয়দাতাসহ পুরো খুনিচক্রকে অতি দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে ১২ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সরকারের পক্ষ থেকে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও সহকারী উপদেষ্টা খোদা বকশ চৌধুরীকে জাতির সামনে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
গ্রেপ্তার চোরাকারবারি সিবিউন ও সঞ্জয় ফের ৫ দিনের রিমান্ডে
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার মামলায় সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিমকে ফের জিজ্ঞাসাবাদে ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। গতকাল রোববার ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. সেফাতুল্লাহ তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে রিমান্ডের এ আদেশ দেন।
হত্যাচেষ্টা মামলা হত্যা মামলায় রূপান্তরিত
এদিকে ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টা মামলা হত্যা মামলা হিসেবে গণ্য করতে পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। শনিবার ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ দণ্ডবিধি ৩০২ ধারা (হত্যা) সংযোজনের আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্দিক আজাদ হত্যার ধারা সংযোজনের আদেশ দেন। গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। পরে আদালত তা মঞ্জুর করেন বলে জানা গেছে।
বিচারের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা ওসমান হাদির বড় ভাইয়ের
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তার ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি বলেছেন, আন্দোলনের চাপ না থাকলে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার আদায় করা কঠিন হবে। বিচার চাইলে আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর মগবাজারের আল-ফালাহ মিলনায়তনে ওসমান বিন হাদির শাহাদাত উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত দোয়া মাহফিলে তিনি এসব কথা বলেন। ওমর বিন হাদি বলেন, ‘ওসমান হাদিকে যদি সত্যিই ভালোবাসেন, তার হত্যার বিচার চান এবং শাহবাগকে ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদমুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।’
ফয়সালসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যাংকে ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটির বেশি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। গতকাল রোববার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানিয়েছেন সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব।
বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে সিআইডি এই অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী ফয়সালসহ তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থপাচার সংক্রান্ত অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে সিআইডি।
এতে আরও বলা হয়, প্রধান অভিযুক্ত ফয়সালের স্বজনদের বাসায় পুলিশ ও র্যাবের অভিযানের সময় প্রাপ্ত বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবইয়ের তথ্য সিআইডি গুরুত্ব নিয়ে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু করে। এতে দেখা যায়, অভিযুক্ত ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু চেকবইয়ে বিভিন্ন পরিমাণ অর্থের কথা উল্লেখ রয়েছে। চূড়ান্ত লেনদেন সম্পন্ন না হওয়া এসব রেকর্ডের সমষ্টিগত মূল্য প্রায় ২১৮ কোটি টাকা।
তবে সিআইডির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিযুক্ত ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে, যা মানিলন্ডারিং, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম-সংক্রান্ত অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে। বিষয়টি আমলে নিয়ে সিআইডি মানিলন্ডারিং বিষয়ে পৃথক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।
ফয়সালের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা মামলায় প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল দাউদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন আদালত। রোববার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মোহাম্মদ জুনায়েদ এ আদেশ দেন।

