নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসতেই রাজনীতির মাঠে দেখা দিচ্ছে একের পর এক চমক। এমপি পদে জয় নিশ্চিত করতে নিজ দল বিলুপ্ত কিংবা পদত্যাগ করে বড় দলে মিশে যাচ্ছেন ছোট দলের নেতারা। এরই মধ্যে বিএনপির নির্বাচনি ট্রেনে উঠেছেন চারটি রাজনৈতিক দলের প্রধান ও দুটি দলের মহাসচিব। এর মধ্যে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপির কাঁধে সওয়ার হয়েছেন।
এ ছাড়াও গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানও এমপি হতে চেয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।
তিনি দলটির প্রার্থী হয়ে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে নির্বাচন করবেন। শুধু তাই নয়, আরেক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এলডিপিও জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল এনসিপিও দলের নেতাকর্মীদের একাংশের আপত্তি সত্ত্বেও জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার মাধ্যমে জোট করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট দলগুলো মূলত এমপি পদে বিজয় হাতছাড়া না করার জন্য নিজেদের দল কিংবা পরিচয়ের দিকে না থাকিয়ে বড় দলে ভিড়ছে কিংবা জোট করছে। অবশ্যই ‘আরপিও’ সংশোধন করে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় অনেকে বড় দলে যাচ্ছেন। আর জোটের রাজনীতিতে অনেক কিছুকেই ছাড় দিতে হয় বলেও জানিয়েছেন তারা। সর্বোপরি, এমপি হওয়ার জন্য দল ও পরিচয় বিসর্জনের সাম্প্রতিক ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করেছে নির্বাচন কমিশন। সে অনুযায়ী, অন্য দলের সঙ্গে জোট করলেও নিজের দলের প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে প্রার্থীকে। পুরোনো সুযোগ বহাল রাখার জন্য ইসিতে চিঠি দিয়েছিল বিএনপিসহ তাদের শরিকেরা। কিন্তু কাজ হয়নি। ফলে বিএনপি আসন ছাড় দিলেও নিজেদের অপরিচিত প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয় নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; এমন শঙ্কা থেকেই বিএনপিতে যোগদান করছেন ছোট দলের নেতা। অবশ্য একে কেউ কেউ নির্বাচনি কৌশলও মনে করছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএলডিপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম লক্ষ্মীপুর-১ আসনে, জাতীয় দলের সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ নড়াইল-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এছাড়াও এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ এবং নুরুল হক নূরের নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানও নিজের দলের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে এলডিপির সাবেক মহাসচিব রেদোয়ান কুমিল্লা-৭ আসনে এবং গণঅধিকারের রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষ নিয়ে লড়বেন। এ ছাড়া ববি হাজ্জাজও ঢাকা-১৩ আসন থেকে বিএনপির হয়ে নির্বাচন করবেন।
বিএনপিতে যাওয়া এসব নেতাসহ তাদের অনুসারীরা বলছেন, ছোট দল হওয়ায় নিজস্ব প্রতীক নির্বাচনি এলাকার ভোটারদের কাছে অপরিচিত। ফলে সেই প্রতীক নিয়ে কতটা সুবিধা করতে পারবেন তা নিয়ে শঙ্কায় তারা। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকের সঙ্গে ভোটাররা পরিচিত। এ কারণে তারা ধানের শীষকে নিরাপদ বিবেচনা করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। বিএনপির হাইকমান্ডও বাস্তবতা মাথায় রেখে মিত্রদের ধানের শীষে ভোট করতে উৎসাহিত করছে।
এ প্রসঙ্গে গণঅধিকার পরিষদ থেকে পদত্যাগ করা রাশেদ খান বলেন, ‘আমাকে যে আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে সেটি বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা। তাই নির্বাচনে জেতার জন্য ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। সেজন্য বিএনপিতে যোগ দিয়েছি।’
ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি। তবে আমার দল এনডিএম আমার সঙ্গে কাজ করছে, প্রথম থেকেই বিএনপিও আন্তরিক ছিল। আশা কছি, দলের সঙ্গে কোনো দূরত্ব তৈরি হবে না।’
অবশ্য ছোট দলগুলোর প্রার্থী বড় দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন নতুন নয়। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের ছয়টি আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) একটি আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছিল। কিন্তু সেখানে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেও হাসানুল হক ইনু, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ফজলে হোসেন বাদশা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। নৌকা নিয়ে রাশেদ খান মেনন ও জাসদের রেজাউল করিম তানসেন বিজয়ী হয়েছিলেন। অবশ্য এই নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের আগে নিজ দলই বিলুপ্ত করে বড় দলে যোগ দেওয়াÑ এবার নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এবার এর বাইরে বিএনপির সঙ্গে আরও ছয়টি দল নির্বাচনি সমঝোতা করলেও তারা বিএনপিতে সরাসরি জোটে যায়নি। বিএনপির সমর্থন নিয়ে তারা নিজ দলের প্রতীকেই নির্বাচন করবেন। এর মধ্যে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ ভোলা-১ আসনে দলের প্রতীক গরুর গাড়ি, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না নিজ দলের কেটলি প্রতীকে বগুড়া-২ আসনে, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কোদাল নিয়ে ঢাকা-১২ আসনে ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে তার দলের মাথাল প্রতীকে ও গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক নুরুল হক নূর দলীয় প্রতীক ট্রাক নিয়ে পটুয়াখালী-৩ থেকে নির্বাচন করবেন।
বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে চারটি আসনে ছাড় দিয়েছে বিএনপি। দলের নিবন্ধন থাকায় তারা নিজ প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করবেন। এর মধ্যে সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসেন কাসেমী খেজুর গাছ নিয়ে লড়বেন। তবে দলটির নিবন্ধনবিহীন অংশের নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাস যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে নির্বাচন করবেন ধানের শীষ নিয়ে।
এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘বিএনপির আগের প্রার্থী সাইফুল আলম নীরবসহ সংশ্লিষ্ট আসনে বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাকে স্বাগত জানিয়েছেন। নির্বাচনে তারা কোদাল প্রতীকে সমর্থন জানাবেন বলে আমি আশাবাদী।’
অন্যদিকে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করবে এমনটা শোনা যাচ্ছিল দীর্ঘদিন থেকে। সর্বশেষ গতকাল রোববার দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, তারা জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। যদিও এ নিয়ে দলটির মধ্যে দেখা দেয় অসন্তোষ। ৩০ জন নেতা আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেন। পদত্যাগ করেন দলের শীর্ষনেতা তাসনিম জারা ও তাসনূভা জাবীনসহ কয়েকজন। তবে দলের ১৭০ জনেরও বেশি নেতার অবস্থান জোটের পক্ষে। তবে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপির জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি জোট ছিল অনেকটা চমক। এর আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানসহ কয়েকজন বিএনপি নেতা ও মুক্তিযোদ্ধার জামায়াতে যোগদান আলোচনা তৈরি করেছিল।
এ প্রসঙ্গে কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, ‘রাজনীতিতে শেষ বলতে কিছু নেই। পর্দার আড়ালে কিংবা পর্দার সামনে অনেক কিছুই ঘটে যা মানুষকে চমকে দেয়’।
জামায়াতের নির্বাচনি জোট প্রসঙ্গে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা কিসের ভিত্তিতে একত্রিত হয়েছি? আমাদের লক্ষ্যের কথা আমরা বলেছি। এটা আমাদের একটি মজবুত নির্বাচনি জোট। নিজেদের মাঝে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন আসন আমাদের মধ্যে আমরা নির্ধারণ করেছি। যেহেতু দুইটা দল একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে আমাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। আরও অনেক আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় এই মুহূর্তে এখানে সম্পৃক্ত করা আমাদের জন্য খুবই দুরূহ হয়ে গেছে। অনেকের আগ্রহ থাকার পরেও আমরা সেভাবে তাদের সম্পৃক্ত করতে পারছি না’।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘সংসদ সদস্য হওয়ার আশায় দল ও আদর্শ বদল করে ফেলছেন অনেকে। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের মতো দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী অবস্থায় দাঁড়ায়নি। এর ফলে ছোট দলগুলোর বিকশিত হওয়ার সুযোগও কমে যাচ্ছে। সরকারের বিপক্ষে চাপ সৃষ্টিকারী গ্রুপ কমে যাচ্ছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের প্রাক্কালে নানা টানাপড়েনের ঘটনা ঘটে। আগেও অনেক ছোট দল বিএনপি-আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করেছে। এবারও তা হচ্ছে। তবে এবার জোটের সময় আমরা কোনো নীতি-নৈতিকতার হিসাব দেখলাম না। যে যেদিকে সুবিধা পাচ্ছে সেদিকে ঝুঁকছে। অনেকে বড় দলের সঙ্গে মিশে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। নিজের দল বিলুপ্ত কিংবা পদত্যাগ করে বড় দলের দিকে ঝুঁকছে। আসলে রাজনীতিতে শেষ বলছে কিছু নেই।’
তিনি আরও বলেন, কর্নেল (অব.) অলি আহমদ জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। বিএনপির সঙ্গেও ছিলেন দীর্ঘদিন। ছিলেন জামায়াতের কড়া সমালোচক। কিন্তু এখন দেখছি তিনি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছেন। আবার এনসিপি নিয়ে মানুষের একটা প্রত্যাশা ছিল। তারা সম্ভাবনাময় দল ছিল। কিছুদিন আগে তারা দেখলাম কয়েকটা দল নিয়ে একটা স্বতন্ত্র জোট করেছে। এখন দেখলাম জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে। আমার মতে, এগুলো রাজনৈতিক প্রতারণা। জনগণ তাদের কতটা গ্রহণ করবেÑ তা নিয়ে আমার শঙ্কা রয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন