ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

গণতন্ত্রের সংগ্রামে সারা জীবন উৎসর্গ করেছেন তিনি

মো. শামসুল আলম সেলিম
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৫:৫২ এএম

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের জনগণ ‘আপোষহীন নেত্রী’ বা ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। এ উপাধি অর্জনের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদই নন, বরং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একজন অভিভাবক ছিলেন। গণতন্ত্র রক্ষায় তার ভূমিকার মাধ্যমে তিনি সমগ্র জাতির অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তাকে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রস্তাব ও প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সে সময় এরশাদের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য ছিল। কিন্তু সেই ঐকমত্য ভঙ্গ করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে অংশ নেয়। বিপরীতে, খালেদা জিয়া ছিলেন তার সিদ্ধান্তে অটল। তিনি সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। তার এই অনড় অবস্থান সে সময় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসিত হয় এবং তখন থেকেই জনগণ তাকে ‘আপোষহীন নেত্রী’ হিসেবে গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সরকারের আমলেও তিনি তার অবস্থানে অনড় থেকেছেন, যা তার এই ভাবমূর্তিকে আরও দৃঢ় করেছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলোÑ তার সংযম ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার। তিনি সব সময়ই একটি অভিভাবকসুলভ ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে যারা তার বিরোধী, তাদের সম্পর্কেও তিনি প্রকাশ্যে কখনো বিদ্রƒপাত্মক বা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছেন। বিগত অনেকগুলো বছর দীর্ঘ কারাবাস সহ্য করেছেন। তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সমালোচনা করতে হেলা করেনি। সেসব সমালোচনা অনেক সময় শালীনতা ও স্বাভাবিকতার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু খালেদা জিয়া কখনো প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত কটুবাক্য বা অশালীন শব্দ প্রয়োগ করেননি। এই সংযম ও ধৈর্য তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় খালেদা জিয়ার নীতিগত অবদান অনস্বীকার্য। তিনি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করেছেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সরে এসে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন ছিল তার অন্যতম সেরা রাজনৈতিক কীর্তি। এ ছাড়া, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করাও ছিল তাঁর নেতৃত্বের একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ।

টানা ১৬ বছরের বেশি সময় নিপীড়ন ও অবিচার সহ্য করেও তিনি কখনও কারও প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করেননি। বারবার গৃহচ্য্যুত ও কারাবন্দি হলেও দেশের মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি কখনও দেশ ছাড়ার কথা ভাবেননি। গণতন্ত্রের সংগ্রামে তিনি সারাজীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। খালেদা জিয়ার এই আপোষহীন ও আদর্শিক নেতৃত্ব বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তার নেতৃত্ব আগামী দিনেও আলোচিত হয়ে থাকবে।

লেখক : অধ্যাপক সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়