ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুয়ারে। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাক্সিক্ষত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি বহুল কাক্সিক্ষত হওয়ার অন্যতম কারণ মাত্র ৮ মাসের মাথায় গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে কি না তা নিয়ে ছিল নানামুখী দ্বিধা। কিন্তু সব দ্বিধা কাটিয়ে একপ্রকার হুঁইসেল বাজিয়ে নির্বাচনি যাত্রা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নতুন একটি নির্বাচনের অপেক্ষায় পুরো দেশ। সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসিও। কিন্তু সেই পুরোনো পদ্ধতিতেই ইসির নির্বাচনি যাত্রাকে অনেকটা হাস্যকর বলছেন বিশেষজ্ঞরা। পূর্বের মতোই চলতি বছরও ভোটারপ্রতি প্রার্থীদের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। একেকজন প্রার্থী ২৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন তাদের নির্বাচনি ব্যয় হিসেবে। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অবাস্তব বলে মত তাদের। শুধু মনোনয়ন নিতেই প্রার্থীরা কোটি টাকার বেশি খরচ করেন দাবি করে তারা বলছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনি ব্যয় একটি বাস্তবসম্মত হিসেবে নির্ধারণ করে কঠোর নজরদারির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
চলতি প্রথা অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচনের ব্যয়সীমা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য একটা সীমা নির্ধারণ করে দেয় ইসি। এটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও)-এর ৪৪ (খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী করা হয়। কিন্তু প্রতিটি সংসদ নির্বাচনের পর অভিযোগ পাওয়া যায়, বেশির ভাগ প্রার্থীই ইসির বেঁধে দেওয়া ব্যয়সীমার মধ্যে থাকে না। বাস্তবে খরচ হয় কয়েকগুণ বেশি। কঠোর নজরদারির অভাবে সাংবিধানিক সংস্থা ইসি কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। ফলে প্রার্থীদের ব্যয়ের সীমাটি শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
ইসির তথ্যমতে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৩০০ সংসদীয় আসনে একজন প্রার্থী ভোটার প্রতি কত টাকা খরচ করতে পারবে, তার একটি সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যে আসনে যত ভোটার থাকবে ওই প্রার্থীর ব্যয়ের অনুমতি থাকবে তত বেশি। ফলে ইসির অযৌক্তিক ব্যয়সীমায় মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য হন প্রার্থীরা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ প্রার্থীরাও। তারা বলছেন, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লেও ইসি বাড়াচ্ছে না নির্বাচনি ব্যয়ের খাত।
সনাতনী এ পদ্ধতিটিকে এখন হালনাগাদ করার সময় এসেছে উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আর আগের জায়গায় নেই। ইসি যে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে দেয় প্রার্থীদের এবারও তার বাইরে কিছু করেনি। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২৫ বা ৮০ লাখ তো নয় শুধু দল থেকে মনোনয়ন নিতেই একেকজন প্রার্থীকে কোটি টাকার ওপর খরচ করতে হয়। আর নির্বাচনি খরচ তো পরের বিষয়। সেটা হবে কোটি কোটি টাকা। তাই ইসিকে একটি স্পষ্ট নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষ করে প্রার্থীদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই নির্বাচনি ব্যয়সীমাটা হালনাগাদ করতে হবে। এটাকে একটা বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে।
ইসির প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রত্যেকটি আদম শুমারির পর পার্বত্য তিনটি জেলা বাদে বাকি আসনগুলোতে সীমানা বিন্যাস করা হয়। এক্ষেত্রে আসনের জনসংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রশাসনিক অখ-তা ইসিকে বজায় রাখতে হয়। কিন্তু কর্মসংস্থানের কারণে বেশির ভাগ মানুষ শহরমুখী। আসনপ্রতি জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা বিন্যাস করা হলে গ্রামীণ পর্যায়ে আসন কমবে, বাড়বে শহরকেন্দ্রিক এলাকায়। এ শর্তে আটকে রয়েছে ইসি। ফলে আসনপ্রতি ভোটারের সংখ্যাতেও বৈষম্য রেখেই সংসদীয় আসন বিন্যাস করা হয়। এতে ভোটার সংখ্যায় তারতম্যের কারণে কোনো প্রার্থী সর্বনিম্ন টাকা খরচ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, অন্য প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সর্বোচ্চ টাকা ব্যয় করে। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসেবে সযোগ-সুবিধা ও মর্যাদায় উভয় প্রার্থীই সংসদের সমান সুযোগ পেয়ে থাকেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এতে করে প্রার্থীরা যেমন একে অন্যের কাছে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও একটা অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। যদি ইসি পূর্বের মতোই ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে রাখে তাহলে অতি অবশ্যই এটিকে কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকটা প্রার্থীকে মনিটরিং করে প্রকৃত ব্যয় বের করতে হবে ইসিকে; যা প্রায় অসম্ভব। কারণ এসব ব্যয়ের বেশির ভাগই হয় অন্ধকারে। যেহেতু ব্যয়সীমা নির্ধারণ না করলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত হবে না, সেহেতু এটি রাখতেই হবে। তবে তা যেন বাস্তবসম্মত হয় সে বিষয়ে ইসিকে নজর দিতে হবে।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, কোনো প্রার্থী নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করলে এবং সেটা নির্বাচন কমিশনের কাছে ন্যায়সঙ্গত মনে না হলে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল হতে পারে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট উপলক্ষে তিনশ সংসদীয় আসনের ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ভোটার তালিকার তথ্যানুযায়ী, তিনশ আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার সংবলিত আসন রয়েছে বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে গাজীপুর-১ ও ২, ঢাকা-১৯ ও নোয়াখালী-০৪। এর মধ্যে গাজীপুর-২ আসনে ৮ লাখ ৪ হাজার জন ভোটার। এসব আসনের যারা প্রার্থী হবেন তাদের জন্য ইসির ব্যয়ের অনুমতি রয়েছে ৮৪ লাখ টাকার মতো। অনুরূপভাবে, ঢাকা-১৯ আসনে সাত লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটার, গাজীপুর-১ আসনে ৭ লাখ ২০ হাজারে এবং নোয়খালী-৪ আসনে ৭ লাখ তিন হাজার জন ভোটার।
অপরদিকে, তিন লাখের কম ভোটার রয়েছে এমন আসন সংখ্যা ২০টির মতো। যার মধ্যে ঝালকাঠি-১ আসনে সবচেয়ে কম ২ লাখ ২৮ হাজার জন ভোটার। কম ভোটার সংবলিত বাকি আসনগুলো হচ্ছে, ময়মনসিংহ-৩, সাতক্ষীরা-৪, নীলফামারী-৩, নড়াইল-১, ঢাকা-৬, নেত্রকোনা-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, নরসিংদী-২, নরসিংদী-৩, জামালপুর-২, লক্ষ্মীপুর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ঢাকা-৮, মেহেরপুর-২, বাগেরহাট-৩, চট্টগ্রাম-৩, খুলনা-৩, পিরোজপুর-৩ ও যশোর-৬। অর্থাৎ ভোটারের এর তারতম্যের কারণে কোনো প্রার্থী নির্বাচনি ব্যয় ২৫ লাখে সম্পন্ন হবে, কারো লাগবে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা।
নির্বাচনি ব্যয়ের বেঁঁধে দেওয়া সীমাকে ইসির একটি প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, নির্বাচনের আগে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও শক্তি প্রদর্শনসহ রাজনৈতিক প্রচারে বিপুল অর্থ করেন একেকজন প্রার্থী। কিন্তু এসব বিষয়ে কেউ কোনো আলোচনা করেন না। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে ফ্যাসিবাদি শক্তির পরিবর্তন আসলেও রাজনীতিতে আসলে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতা দখলের জন্য নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা ও এর বাণিজ্যিকীকরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতায় টিকে থাকা বা ক্ষমতা পাওয়ার মানসিকতা দেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কোনো চাহিদা নেই; তারা একসাথে বসতে বা অতীত থেকে শিখতে ইচ্ছুক নয়। অন্য সময়গুলোতে আমরা যেমন দেখেছি রাজনৈতিক দলের কর্মীরা প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন এই আশায় যে পরবর্তীতে তারা নেতাদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পাবেন। ব্যবসায়ীরাও এই সুযোগ কাজে লাগাতে রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে জড়িত হয়েছে; তাদের কাছে এটি একটি বিনিয়োগের ক্ষেত্র। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে ব্যয়ের তথ্য জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এটি কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হয় না। ব্যয় সীমাবদ্ধতা বাস্তবে কতটা যথাযথভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
নিজের নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৭ হলেও আসনটি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ছেড়ে দিয়ে এখন ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচন করছেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তার নির্বাচনি ব্যয় ঠিক কত হতে পারে জানতে চাইলে তিনি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এখনো নির্বাচনের অনেক দেরি। আমি আগে ঢাকায় যখন প্রচার চালিয়েছি তখন আমার দলের নেতাকর্মীরাই খরচ করেছেন। এখন ভোলায়ও একই অবস্থা। দেশের অর্থনীতি আর আগের জায়গায় নেই। ইসিকে এ বিষয়টি বিবেচনা করে নির্বাচনি ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা উচিত বলে আমিও মনে করি। এতে করে প্রার্থীদের মিথ্যার আশ্রয় নিতে হবে না। আমি আমার জায়গায় স্বচ্ছ থাকব অথচ অন্য এক প্রার্থী বেশি অর্থ ব্যয়ে পাস করে ক্ষমতায় আসবে, এটা হতে পারে না। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি।
একইভাবে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্যপ্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি হয়েছে। প্রার্থীদের সক্ষমতার জায়গাও বেড়েছে। তাই কাউকে যাতে মিথ্যার আশ্রয় না নিতে হয় নির্বাচনি ব্যয় নিয়ে, এ বিষয়ে ইসির সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে আমি মনে করি। এতে করে বাজারে কালো টাকার ছড়াছড়িও হবে না। অর্থনীতিতে একটা সাম্যতা আসবে।
যেহেতু এটি আইনে রয়েছে তাই এই মুহূর্তে এটি নিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই জানিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আগে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারতেন। আসনওয়ারী ভোটার তারতম্যের কারণে ইসি থেকে এই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা একজন প্রার্থী ব্যয় করতে পারবে। তবে যেখানে ভোটার সংখ্যা বেশি সেখানে ব্যয় বেশি হবে। এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত আইন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আর মাত্র কিছুদিন বাকি। এই মুহূর্তে আইন পরিবর্তন কিছুটা কঠিন। তারপরও প্রার্থীরা যদি চায় ইসি হয়তো এটি বিবেচনা করবে।
নির্বাচনি ব্যয়ের ক্ষেত্রে যদি ইসি একটি স্বচ্ছ অবস্থান না নেয় তাহলে অবৈধভাবে অর্থের ব্যয়ের পাশাপাশি দেশে অপরাধ বাড়ার প্রবণতাও বাড়বে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, কারণ অধিকাংশ প্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য যেকোনো উপায়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করেন। যেকোনো উপায়ের মধ্যে পেশিশক্তি ও অর্থশক্তির দাপট সবচেয়ে বেশি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন