ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নিজ প্রার্থীর প্রচারে সমাবেশ, উঠান বৈঠক ইত্যাদিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। নির্বাচনি প্রচারের এমন জমজমাট পরিবেশের ছোঁয়া লেগেছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের নির্বাচন। রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টি অংশ নিলেও নির্বাচনি প্রচারে অনেক পিছিয়ে দলটি।
ভোটের মাঠের বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরেই হতে যাচ্ছে নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, বরাবরের মতো আসন্ন নির্বাচনেও কিছু কিছু আসনে সংখ্যালঘুদের ভোটপ্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তথ্য অনুসারে, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সংখ্যালঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট সনাতনি হিন্দুদের। এবার নির্বাচনে হিন্দুদের অবস্থান কোন দিকে থাকবে- সে নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। এ বিষয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পেশাজীবী, সাধারণ মানুষ এবং হিন্দু ধর্মীয় একাধিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছে রূপালী বাংলাদেশ।
তাতে স্পষ্ট যে, স্থানীয়ভাবে প্রতিটি আসনের আলাদা হিসাব-নিকাশের সূত্র ধরে ভোট দেবেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। অনেকে ভোট দেওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে তাদের ভয় ভোটকেন্দ্রে সংঘাত-সংঘর্ষ। ঠিক কোন পক্ষে যাচ্ছে সনাতনিদের ভোট, তা নিশ্চিতভাবে কেউ না বললেও আলাপে বোঝা যায়, ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের ভোটের বড় অংশ বিএনপির পক্ষেই পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভোটের মাঠে মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক ইস্যুকে বড় করে দেখছেন হিন্দু ভোটাররা। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও সেটিকে বিবেচনায় রাখছেন তারা।
২০২২ সালের বিবিএস (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো) জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এর মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বী প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৯৫ থেকে ৭.৯৬ শতাংশ। এ ছাড়া বৌদ্ধ ০.৬১, খ্রিষ্টান ০.৩০ এবং অন্যান্য ধর্মের অনুসারী রয়েছেন ০.১২ শতাংশ। তবে হিন্দু ধর্মীয় সংগঠনের মতে, দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন দেড় কোটিরও বেশি। এদিকে আসন্ন নির্বাচনে মোট ভোটার রয়েছেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। হিন্দু ভোটারের পরিসংখ্যান আলাদাভাবে তৈরি করা হয় না। তবে হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্র তাদের ধারণা অনুযায়ী ১ কোটি ১২ থেকে ১৫ লাখের মতো ভোটার থাকার তথ্য জানিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশের ৯২টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন ১৫ থেকে ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া ৫০টি আসনে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ। এতে সারা দেশের ৭০ থেকে ৮০টি আসনে হিন্দু ভোট সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা ও অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার রাজনীতির কারণে সাধারণ হিন্দুসহ সংখ্যালঘুদের মধ্যে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার একটা ‘ট্রেন্ড’ গড়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার দেবনাথ। আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে অন্য দল খোঁজার চেষ্টা থাকলেও নানা কারণে হিন্দুরা তা পায়নি বলে তিনি মনে করেন। ভীতি ও সংশয় থাকলেও বিভিন্ন আসনে স্থানীয়ভাবে নানা হিসাব-নিকাশের কারণে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বড় একটি অংশ নির্বাচনে ভোট দেবেন বলে তিনি মনে করেন। ভোটের প্রতি সংখ্যালঘু ভোটারদের এখনো তেমন আগ্রহ দেখা না গেলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা যদি তাদের উজ্জীবিত করতে পারেন, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন নির্বাচনে কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই হিন্দু ভোটাররা অংশ নেবেন।
তিনি বলেন, হয়তো কোথাও কোথাও তারা (আওয়ামী লীগ) ভোটারদের ওপর ভোটকেন্দ্র্রে না যাওয়ার জন্য প্রভাব খাটাতে পারে। তবে সেটি খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি সমাবেশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে প্রায় দুই-তিন হাজার হিন্দু ভোটার উপস্থিত ছিলেন এবং সবার মধ্যেই স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা গেছে। হিন্দুসহ সংখ্যালঘু ভোটাররা নির্বাচনে সঠিক দলকেই বেছে নেবেন বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও সিলেটের মিরাবাজারে অবস্থিত দেশের প্রাচীন ‘শ্রী শ্রী বলরাম জিউর আখড়া’ মন্দিরের সভাপতি গোপিকা শ্যাম পুরকায়স্থ বলেন, হিন্দু হলেই আওয়ামী লীগের ‘ট্যাগ’ লাগবে বিষয়টি এমন নয়, তাই সবাইকে বলেছি এবারের নির্বাচনে সবাইকে ভোট দিতে যেতে হবে, প্রমাণ করতে হবে সবাই আওয়ামী লীগ না। তিনি আরও বলেন, সবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেছি, আমাদের সিলেটে সর্বধর্মের একটি রাজনৈতিক বন্ডিং রয়েছে, তাই এখানকার বিষয়টি ভিন্ন।
বিতর্ক এড়াতে নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য, বক্তব্য-বিবৃতি না দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে বলে জানান আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) মুখপাত্র হৃষিকেশ গৌরাঙ্গ দাস। ‘দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হোক’- ইসকন এমনটাই প্রত্যাশা করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে ভোটের আগে ও পরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাসহ ৭ দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।
লিখিত বক্তব্যে মহাজোটের নির্বাহী মহাসচিব ও মুখপাত্র পলাশ কান্তি দে বলেন, ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে ফিরে আসা, মঠ-মন্দির, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিমা যেন ভাঙচুর না হয়- সেদিকে খেয়াল রেখে নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।
মহাজোটের যুব সংগঠন হিন্দু যুব মহাজোটের সভাপতি প্রদীপ কান্তি দে বলেন, বিএনপি জানে হিন্দুরা কখনোই দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবে না। যদি দেয় তাহলে বিএনপিকেই দেবে, তাদের এই ধারণা সঠিক। তবে বিএনপির চ্যালেঞ্জ হচ্ছে হিন্দু ভোটারদের কেন্দ্রে আনা। অনেক হিন্দুধর্মীয় সংগঠন বিএনপিকে আহ্বান জানিয়েছিল, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যদি কিছু ন্যায্য দাবি ও নিরাপত্তার বিষয়ে কথা বলতেন, তাহলে হিন্দুরা মানসিকভাবে সাহসী হতো।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মনে করেন, আওয়ামী লীগ না থাকলেও অধিকাংশ হিন্দু ভোট দিতে যাবেন। এসব ভোটের অধিকাংশই বিএনপির পক্ষে যাবে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সদরের দুই ইউনিয়ন) আসনে কাকে ভোট দেবেন তা নিয়ে দ্বিধায় পড়েছেন এই আসনের পঞ্চবটি এলাকার একটি মন্দিরের সভাপতি ও এক পেশাজীবী।
তিনি বলেন, হিন্দুরা ভোট দিতে চায়। কিন্তু কাকে দেবে- সেটাই প্রশ্ন। এখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী রয়েছেন, তিনি অনেকের বিবেচনায় রয়েছেন।
এখানে কোনো দলই এখনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি মন্তব্য করে এই পেশাজীবী আরও জানান, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি সমিতির অডিটোরিয়ামে ক্লথ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সভায় ধানের শীষের পক্ষে সনাতনিদের ভোট কামনা করা হয়।
ঢাকা-৬ আসনের (সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালির আংশিক) ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাড়িওয়ালা, যিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে জন্যও স্থানীয়ভাবে পরিচিতি, তিনি মনে করেন, হিন্দুদের কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়া প্রয়োজন, না হলে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার যে ধারণা বিদ্যমান, তা সত্য হবে।
ঢাকা-৬ আসন এলাকার একটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক তিনি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিন একই অঞ্চলের যদুনাথ সরকারি প্রাথমিক স্কুল ভোটকেন্দ্রে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করবেন এই শিক্ষক। যেহেতু নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে থাকবেন, তাই পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সব প্রস্তুতি সেরে নিয়েছেন বলে জানান।
সংখ্যালঘু প্রার্থী যারা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হিন্দুধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৮০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ১২ জন। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী রয়েছেন ১০ জন।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২২টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৬৮ জনকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে। দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭ জন সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এ ছাড়া বিএনপি ছয়জন, জামায়াতে ইসলামী একজন, জাতীয় পার্টি চারজন, জাতীয় নাগরিক পার্টি একজন, গণসংহতি আন্দোলন দুজন, গণফোরাম তিনজন ও গণধিকার পরিষদ থেকে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে এবার আটজন নির্বাচন করছেন। তাদের মধ্যে সাতজনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।
বামপন্থি দলগুলোর মধ্যে সিপিবি ছাড়া বাসদ (মার্কসবাদী) সাতজন, জেএসডি এক, বাংলাদেশ জাসদ দুজন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি দুজন, জাকের পার্টি একজন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট একজন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি একজন, বাংলাদেশ কংগ্রেস একজন, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি একজন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি একজন, বাংলাদেশ লেবার পার্টি একজন এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট থেকে একজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ১২ জন ভোটের লড়াইয়ে আছেন। এর মধ্যে কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়া নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করছেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটার রয়েছেন ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন। নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪। এ ছাড়া, হিজড়া ভোটার রয়েছে ১ হাজার ১২০ জন। ২৯৮টি আসনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন