চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিন ধরে চলা সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শেষ। টানা কদিন যৌথ বাহিনীর অভিযানে সন্ত্রাসীদের কিছু আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উদ্ধারও হয় কিছু অস্ত্র। গ্রেপ্তার হয় কয়েকজন দলনেতাসহ কিছু পেশাদার সন্ত্রাসী।
অভিযান শেষ হলেও জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে অনেকের মনে কিন্তু প্রশ্ন রয়েই গেছে, আর তা হলো, পুরো এলাকা কি এখন সত্যিই নিরাপদ? স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ওই এলাকার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। অনেক সদস্য পাহাড়ি জঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। শীর্ষনেতাদের অনেকে আত্মগোপন করেছে। এ ধরনের অভিযানের সঙ্গে তারা পরিচিত এবং সুযোগ বুঝে আবারও ফিরে আসবে। ফলে অভিযান শেষ হলেও আতংকের শেষ নেই সেখানকার শান্তিপ্রিয় মানুষের। এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’
পুলিশ সূত্র জানায়, এবারের অভিযানে সন্ত্রাসী গ্রুপের কয়েকজন শীর্ষ ও সক্রিয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরু, রুবেল, সোহেল ওরফে কানা সোহেল, জসিম উদ্দিন এবং বাবুল মিয়া। তাদের সবারই পৃথক দল রয়েছে। তাদের মূল পেশাই হচ্ছে পাহাড়ি এলাকায় চাঁদাবাজি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, মাদক ও অস্ত্র বিক্রি এবং দখল। তারা গ্রেপ্তার হলেও ইলিয়াস, শাহিন, ইয়াসিন, রবিউল, নাসির, জয়নাল, রোকন, কালা জাহাঙ্গীর, লিটন, ইলিয়াস, শফিক, সেলিমসহ বেশ কয়েকজন দলনেতা এখনো পলাতক। অভিযান চলাকালে অনেকে বোরকা পরে পালিয়ে যায়। এদিকে রোকন জঙ্গল সলিমপুরে না থাকলেও বাইরে থেকে গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমানে তিনিও গা-ঢাকা দিয়ে আছেন।
সূত্র আরও জানায়, পলাতক এসব শীর্ষ সন্ত্রাসী সম্ভবত সীতাকু-ের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ফৌজদারহাট পাহাড় এলাকা, ভাটিয়ারী ও আশপাশের জঙ্গল, হাটহাজারীর সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলে পালিয়ে আছে।
পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি শুধু চাকরি নয়, চট্টগ্রামের সীতাকু- উপজেলার পাহাড়ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকা জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে ছোটখাটো গবেষণাও করেছেন। কয়েক দশক আগেও যেখানে ছিল বন ও পাহাড়ি ঝোপঝাড়। আজ সেখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এক অনিয়ন্ত্রিত জনবসতি। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি পাহাড়ের ওপর আরেক শহর। মূলত এই জনপদের যাত্রা শুরু ১৯৯০ সালের দিকে। সরকারি হিসাব না থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন ও গবেষকদের ধারণা, এখানে এখন প্রায় ৪০ হাজার ঘর এবং ২ থেকে ৩ লাখ মানুষের বসতি। অবৈধ দখল, অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা, সারা দেশের শীর্ষ অপরাধীদের অস্ত্র লেনদেন ও পরিবেশ ধ্বংসÑ সব মিলিয়ে এই জঙ্গল সলিমপুর এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কামরুল ইসলাম আরও বলেন, এই সলিমপুর জঙ্গলের আলীনগর আর আরফিন নগর এলাকায় সন্ত্রাসীদের বসবাস ছিল সবচেয়ে বেশি। মূলত এই দুই এলাকাই সবচেয়ে ভয়ংকর। জঙ্গল সলিমপুর এখন কার্যত একটি অনানুষ্ঠানিক নগরী। হাজার টিন ও আধাপাকা ঘর, বাজার, মুদিদোকান, হোটেল, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, ছোটখাটো কারখানা ও গুদাম, গ্যারেজ ও ট্রান্সপোর্ট কার্যক্রমের অফিসও আছে এই জঙ্গলের ভেতর। পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে তিন দশক ধরে। ১৯৯০ সালের দিকে পাহাড়ি এলাকা দখল করে কিছু শ্রমজীবী পরিবার বসতি স্থাপন করে। ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দখল ও বসতি দ্রুত বাড়ে। আর তখনই মূলত ভূমি ব্যবসায়ী চক্র সক্রিয় হয় এই এলাকায়। এরপর তারাই শুরু করে দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা-। ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় বড় আকারে বিস্তার ঘটে বসতির। পাহাড় কেটে জমি ভাগ করে বিক্রি করে দেয় একাধিক ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। পরে সেখানে গড়ে ওঠে বসতি। সলিমপুর মূলত সে সময় থেকেই সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে রূপান্তরিত হয়। চাঁদাবাজি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসাসহ পাহাড়ি বসতি নিয়ন্ত্রণ শুরু করে এই সিন্ডিকেট। শুরুতে এই সলিমপুরের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল আক্কাস নামে এক ব্যক্তির। এখন তার অস্তিত্ব না থাকলেও কমপক্ষে ২০টি গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেছে সলিমপুরে। বলা চলে, দীর্ঘদিন একধরনের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই ছিল এ এলাকা। জমি দখল, অপরাধীচক্র, রাজনৈতিক প্রভাব আর প্রশাসনের ব্যর্থতায় জঙ্গল সলিমপুর হয়ে উঠেছিল অপরাধ-সাম্রাজ্য। রাজধানীসহ সারা দেশের অনেক অপরাধী এই এলাকা থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় করে। অনেকে বিপদে পড়ে এখানে লুকিয়ে থাকে বা আশ্রয় নেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক পুলিশ সদস্য এই প্রতিবেদককে বলেন, এই দুর্গম এলাকাটি অপরাধীদের জন্য সহজ হয়ে ওঠে এই কারণে যে, এখানে জমি কিনতে দলিল লাগে না। যার দখল শক্তিশালী, জমি তার। এলাকাটি ভৌগোলিকভাবেও দুর্গম। চারপাশে গহিন জঙ্গল, সরু রাস্তা আর ঘনবসতি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ভয় কম। এগুলোই সন্ত্রাসীদের জন্য প্লাস পয়েন্ট। তিনি আরও বলেন, অভিযান এই এলাকায় নতুন নয়। গত এক দশকে কয়েকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। এসব অভিযানে কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়। অভিযান পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তবে এসব অভিযান অল্প সময়ের মধ্যেই থেমে যায়। রাজনৈতিক প্রভাব ও ভূমিদস্যুদের কারণে প্রশাসনের পদক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে কিছুদিন শান্ত থাকে, তারপর আবার সব শুরু হয়।
তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের আরেক বড় সংকট পাহাড় ধ্বংস। পরিবেশ অধিদপ্তরও নিশ্চুপ। ব্যাপকভাবে পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করা হয়েছে, বনভূমি উজাড় হয়েছে, ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এরপর তারা নিশ্চুপ কেন, তা সহজেই বোধগম্য। অথচ, চট্টগ্রামে পাহাড় ধ্বংসের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি এখন জঙ্গল সলিমপুর। একবাক্যে বলা যায়, প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল থাকায় এবং পাহাড়ি এলাকায় পরিকল্পনাহীন বসতি গড়ে ওঠায় সন্ত্রাসীরা সহজে এখানে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে পেরেছে।
সলিমপুর এলাকায় কয়েকজন বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে টেলিফোনে জানান, এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা শান্তিপ্রিয় এবং অতি দরিদ্র। তারা মূলত সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের কাছে জিম্মি। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেন না। এখন দুটি ক্যাম্প করা হয়েছে। একটি পুলিশের, আরেকটি র্যাবের। প্রতি ক্যাম্পে ১০-১২ জন করে সদস্য রয়েছেন। কিন্তু তারাই বা এই জঙ্গলে কতটা নিরাপদ, সেটাও অনেকের প্রশ্ন।
তারা আরও বলেন, সন্ত্রাসীরা এখন আশপাশের ফতেহাবাদ, বায়েজিদ বোস্তামী সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চল, চন্দ্রনাথ পাহাড়, কুমিরা পাহাড়ি বনাঞ্চল, মিরসরাই সীমান্তবর্তী পাহাড়, সীতাকু- রেললাইন সংলগ্ন গ্রাম, হাটহাজারীর কিছু গ্রামীণ এলাকাসহ পাহাড়ঘেরা বসতি ও অবৈধ কলোনিতে লুকিয়ে আছে। পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই ফিরে আসবে। এছাড়া অভিযানে যেসব অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তা হাস্যকর। কারো কারো কাছে প্রশ্নবিদ্ধও।
স্থানীয়রা জানান, অনেক সন্ত্রাসীর কাছে অত্যাধুনিক ছোট-বড় আগ্নেয়াস্ত্র আছে। কিন্তু সেগুলোর একটাও উদ্ধার হয়নি। ফলে অপরাধীদের নতুন করে সংঘবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েই গেছে। এসব ঘিরেই আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
এলাকাবাসীর মতে, এখানে লাখ লাখ মানুষের বাস। পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ করলে মানবিক সংকট তৈরি হবে। এই এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সবার আগে বড় বড় সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার, স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণসহ সরকারকে পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত কয়েক বছরে অবৈধ দখল ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে জঙ্গল সলিমপুর একটি অঘোষিত অপরাধকেন্দ্রে পরিণত হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, তারা সন্ত্রাসীদের অনেক ঘাঁটি বা স্থাপনা ধ্বংস করতে পেরেছেন। এখন পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত। এই এলাকাগুলোতে গোপন নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। অবৈধ বসতি ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চলবে। তবে শতভাগ নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে। কেননা, এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি এবং জায়গাটিও অনেক দুর্গম। এরপরও প্রাকৃতিক এসব শত বাধা উপেক্ষা করে পলাতকদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। চেষ্টা চলছে অস্ত্র উদ্ধারেরও।

