ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথে সৃষ্ট বাধা দূরীকরণে সরকারের জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন

 রেজাউল করিম খোকন : কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০২:২৯ এএম

বিভিন্ন দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ ও উন্নত ক্যারিয়ার গঠনের সম্ভাবনার কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী পাড়ি জমান বিশ্বের নানা প্রান্তে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই স্বপ্ন সফল করতে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। যা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যেতে ইচ্ছুক অগণিত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত হলেও ইদানীং প্রকট হয়ে উঠছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন আজকের তরুণদের মধ্যে বেশ সাধারণ।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ, সঠিক দেশ নির্বাচন আবেদনকারীর শিক্ষা, ক্যারিয়ার ও ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। কোন দেশ উচ্চ শিক্ষার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, তা নির্ধারণের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মান, পড়াশোনার খরচ, ভাষা ও সংস্কৃতি, ভিসাপ্রক্রিয়া, স্কলারশিপের সুযোগ ও পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা প্রতিটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে নিজের প্রয়োজন ও লক্ষ্য অনুযায়ী সেরা দেশ নির্বাচন করা সহজ হয়।

একসময় শুধু বৃত্তি পেয়ে বিদেশে পড়তে যেতেন মেধাবী শিক্ষার্থীরা, যার খরচ বহন করত সেই দেশগুলো বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এর পাশাপাশি এখন নিজেরা খরচ করে সন্তানদের বিদেশে পড়াতে পাঠাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনা করতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেতে চান। কেউ কেউ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও বিদেশে চলে যান। এর ফলে বিদেশে শিক্ষা খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিদেশে শিক্ষার পুরো খরচই মেটাতে হচ্ছে বিদেশি বিভিন্ন মুদ্রায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বিদেশে শিক্ষা বাবদ বাংলাদেশ থেকে ব্যয় হওয়া অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে খরচ হয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ ১০ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২৪ টাকা হিসাবে)। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই খরচ প্রায় ১০৫ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ মূলত টিউশন ফি, আবাসন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। গত পাঁচ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতের খরচ পাঠানো দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪৩ কোটি ২ লাখ ডলার, যা পরবর্তী বছরগুলোতে নিয়মিতভাবে বাড়তে থাকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৫২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও বেড়ে হয় ৫৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। তবে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যায় পরবর্তী দুই অর্থবছরে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষার পেছনে শিক্ষার্থীদের খরচ হিসেবে পাঠানো ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ ডলার এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে খরচ পাঠানো বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই খরচ প্রায় ১০৫ শতাংশ বা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, তবে মানের বিস্তার হয়নি। আমাদের শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ সেভাবে ঘটেনি, ফলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে।

এটা এক ধরনের আন্তর্জাতিক অঙ্গনমুখিতা, অন্যদিকে দেশীয় মানের দুর্বলতা। এটা সহজেই কমবে না। আমাদের নিজেদের জন্য শিক্ষার মানের উন্নতি ঘটিয়ে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে হবে, যাতে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমে আসে।

বিদেশে যেতে হলে শিক্ষার্থীদের প্রথমে সেই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এমন যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য দেশেও এখন অনেক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একজন শিক্ষার্থী বৈধভাবে কোনো বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির অফার লেটার পেলে ব্যাংকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়ে ‘স্টুডেন্ট ফাইল’ খুলতে পারেন। এই ফাইলের মাধ্যমে টিউশন ফি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা সেই দেশে শিক্ষার্থীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো যায়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিবার শুধু এক সেমিস্টারের খরচ পাঠানো যায়। সেমিস্টারের ফলাফল ও পরের সেমিস্টারে উন্নীত হলেই শুধু পরবর্তী সেমিস্টারের খরচ পাঠানোর অনুমতি মেলে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ গ্র্যাজুয়েশন পর্যায়ের কোর্সে পড়াশোনা করেন। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসংক্রান্ত বিষয়ে ভর্তি হন তারা। এসব কোর্স সম্পন্ন ও গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করতে সাধারণত বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া গবেষণার জন্য তহবিলের ঘাটতি বা ব্যক্তিগত নানা কারণেও অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা শেষ করতে অতিরিক্ত সময় লেগে যায়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে বা ভিসাকে অন্য ধরনের ভিসায় পরিবর্তন করতে মাত্র ৩০ দিন সময় দেওয়া হবে। আগে এ জন্য ৬০ দিনের সুযোগ ছিল। নতুন এ নীতি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে চলা একটি ব্যবস্থায় অযথা অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করবে। এটি এমন একটি সমস্যার সমাধান খুঁজছে, যার বাস্তবে অস্তিত্বই নেই। এ নতুন নিয়ম বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। অভিবাসনবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত কানাডা তাদের নীতিতে এবার বড় ধরনের লাগাম টানতে শুরু করেছে। অটোয়া কর্তৃক কার্যকর হওয়া নতুন অভিবাসন ও সীমান্ত আইন ‘বিল সি-১২’-এর প্রভাবে দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার শরণার্থীর আবেদন বাতিল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই কঠোর অবস্থানের কারণে অনেক অভিবাসন প্রত্যাশীকে শেষ পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। নতুন এই আইনের আওতায় শরণার্থী প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের ২৪ জুনের পর যারা কানাডায় প্রবেশ করেছেন, তারা দেশটিতে প্রবেশের এক বছরের বেশি সময় পর শরণার্থী হওয়ার আবেদন করলে তা আর গ্রহণ করা হবে না। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে অবৈধভাবে স্থল সীমান্ত পেরিয়ে আসা অভিবাসীদের আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক গত কয়েক মাসে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যেতে ইচ্ছুক ভিসা প্রত্যাশীদের প্রত্যাখ্যানের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়া গমনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও চলতি বছরে অস্ট্রেলিয়া সরকার হঠাৎ করেই ভিসার জন্য আবেদনকারীদের আবেদন নানা অজুহাতে বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করছে। অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার পরিবারের সহায় সম্বল সবকিছু এবং ব্যাংকে জমানো আমানত গ্যারান্টি হিসেবে বিবেচিত করে প্রদর্শন করেও বিফল হয়েছে। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেসন ফি বাবদ বিশ পঁচিশ লাখ টাকা অগ্রিম জমা দিয়েও ভিসার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকদের প্রায় সবাই বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে লাখ লাখ মানুষের জন্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এখন যদি বাংলাদেশের আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যেতে বাধার সম্মুখীন হয়, বিদেশে তাদের উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ হয়ে যায় তাহলে এক্ষেত্রে স্থবিরতা সৃষ্টি হবে নির্ঘাত। এমতাবস্থায়, বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সীমিত না করে অবারিত করা একান্ত জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন আশা করছি। বিশ্বের উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যেতে আগ্রহীদের জন্য আরোপিত বাধা দূরীকরণে সেই সব দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সৃষ্ট বাধাসমূহ দূর করতে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাদের ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি নিয়ম আরোপের ফলে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হতাশা এবং কষ্ট নেমে এসেছে তা দূরীকরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।