ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে স্মার্ট কৃষি কতটা জরুরি?

প্রফেসর ড. মো. আবু তালেব, অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন
প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০২:২৮ এএম

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্নের নাম স্মার্ট বাংলাদেশ। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে। কৃষিকে পিছিয়ে রেখে কখনোই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। কারণ কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। কৃষিই খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভরসা। কৃষিই কোটি মানুষের জীবিকা। তাই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে গড়তে হবে স্মার্ট কৃষি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনো অনেক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও সরকারি অর্থনৈতিক পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত। কৃষি, মৎস্য ও বন খাত মিলিয়ে দেশের মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ। এই বাস্তবতায় কৃষিকে আধুনিক না করে উন্নয়নের গতি দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব নয়।

বিশ্ব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃষিও বদলে যাচ্ছে। একসময়ের লাঙলনির্ভর কৃষি এখন প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে রূপ নিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, স্যাটেলাইট, সেন্সর, স্মার্ট সেচ, রোবট, বিগ ডেটা এবং ইন্টারনেট অব থিংস এখন কৃষির অংশ। উন্নত দেশগুলো এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম খরচে বেশি উৎপাদন করছে। একই সঙ্গে পানি, সার ও কীটনাশকের অপচয় কমাচ্ছে।

বাংলাদেশেও স্মার্ট কৃষির সম্ভাবনা অনেক। ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে কাজ করছে। কৃষিযন্ত্রে ভর্তুকি, কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবা এবং মোবাইল অ্যাপের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন। অনেক কৃষকের কাছে আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছায়নি। অনেকেই জানেন না কোন জমিতে কতটুকু সার প্রয়োজন। কখন সেচ দিতে হবে। কোন রোগের জন্য কোন ব্যবস্থা নিতে হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। লাভ কমছে।

জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। কখন বৃষ্টি হবে, কখন খরা হবে, কখন বন্যা হবেÑ এখন আর সহজে অনুমান করা যায় না। নতুন নতুন রোগবালাইও দেখা দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির বিকল্প নেই। আবহাওয়ার আগাম তথ্য, মাটির স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ এবং রোগ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কৃষকের বড় সহায়ক হতে পারে।

স্মার্ট কৃষির আরেকটি বড় সুবিধা হলো উৎপাদন ব্যয় কমানো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ড্রোন ব্যবহার করে কীটনাশক ছিটালে কম সময় লাগে। কম শ্রমিক লাগে। কম রাসায়নিক ব্যবহার হয়। একইভাবে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পানির অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এতে উৎপাদন খরচও কমে আসে।

বাংলাদেশে কৃষিশ্রমিকের সংকটও বাড়ছে। অনেক শ্রমিক শহরমুখী হচ্ছেন। ফলে চাষাবাদে শ্রম ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় কৃষিযান্ত্রিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করলে কম সময়ে বেশি জমিতে কাজ করা সম্ভব। কৃষকের আয়ও বাড়ে।

স্মার্ট কৃষি শুধু উৎপাদনের বিষয় নয়। এটি বাজার ব্যবস্থারও পরিবর্তন আনে। বর্তমানে অনেক কৃষক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাজারদর জানতে পারছেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কৃষিপণ্য বিক্রি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমছে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

তবে স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের পথে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, অধিকাংশ কৃষকের জমি ছোট। ছোট জমিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার অনেক সময় ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ। সেই সুযোগ এখনো সীমিত। তৃতীয়ত, গ্রামীণ এলাকায় অনেক জায়গায় এখনো নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবার ঘাটতি রয়েছে। চতুর্থত, কৃষিঋণ ও প্রযুক্তি কেনার জন্য সহজ অর্থায়ন এখনো পর্যাপ্ত নয়।

এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে দ্রুত। কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল কৃষি সেবা ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। সহজ শর্তে কৃষিঋণ দিতে হবে। আধুনিক কৃষিযন্ত্র কেনায় ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে। কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ত করাও জরুরি। আজকের তরুণ প্রযুক্তি বোঝেন। তারা উদ্ভাবন করতে পারেন। তাদের জন্য কৃষিকে একটি আধুনিক উদ্যোক্তা খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অ্যাগ্রি-স্টার্টআপ, স্মার্ট ফার্মিং, কৃষিভিত্তিক ই-কমার্স এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এতে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ স্মার্ট কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। নেদারল্যান্ডস আয়তনে ছোট হলেও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। ইসরায়েল মরুভূমিতেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিতে সাফল্য দেখিয়েছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, জমির পরিমাণ নয়; প্রযুক্তি, গবেষণা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাই কৃষির সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

বাংলাদেশেরও সেই সক্ষমতা রয়েছে। আমাদের আছে উর্বর মাটি, পরিশ্রমী কৃষক এবং দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানী। প্রয়োজন শুধু আধুনিক প্রযুক্তিকে মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষিকে একটি জ্ঞানভিত্তিক খাতে রূপান্তর করা।

স্মার্ট বাংলাদেশ কেবল ডিজিটাল সেবা বা আধুনিক শহর নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে স্মার্ট অর্থনীতি। স্মার্ট সমাজ। স্মার্ট খাদ্যব্যবস্থা। আর সেই খাদ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো কৃষি। কৃষক যদি প্রযুক্তির সুবিধা না পান, কৃষি যদি আধুনিক না হয়, তাহলে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যাবে।

তাই এখনই সময় কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার। প্রযুক্তিকে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার। গবেষণাকে মাঠের সঙ্গে যুক্ত করার। তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করার। কারণ স্মার্ট কৃষিই পারে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কৃষকের আয় বাড়াতে এবং টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে। আর স্মার্ট কৃষি ছাড়া স্মার্ট বাংলাদেশ কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়