আজ পহেলা বৈশাখ, বঙ্গাব্দ ১৪৩৩ এর প্রথম দিন। বাংলা পঞ্জিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নতুন অধ্যায়। নববর্ষের নব আনন্দে আজ আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক এই চিরায়ত উৎসবে মেতে উঠবে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে গোটা জাতি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে উগ্র কট্টরপন্থি মৌলবাদীদের হামলার ভীতি, বিভিন্ন বাধা, প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের সময় মুক্ত পরিবেশে এবারের বাংলা নববর্ষে আনন্দ উল্লাসের সঙ্গে জাতি মেতে উঠবে বৈশাখী উন্মাদনায়। মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে এবারের বৈশাখে মুক্ত বিহঙ্গের মতো শেকড়ের পথে নতুন করে ধাবিত হবে রাজধানীসহ সারা দেশ।
নতুন বাংলাদেশে আবহমান বাংলার রূপ সৌন্দর্যকে ধারণ করে মুক্ত পরিবেশে উদযাপিত হতে যাওয়া এবার বৈশাখ রং ছড়াবে ভিন্নমাত্রায়। রূপসী বাংলার মেঠোপথে কিশোর-কিশোরীর দুরন্তপনায় ছুটে চলা, হালখাতার হিসাব মেটানোর পাশাপাশি বৈশাখী মেলায় লোকজ সংস্কৃতির উৎসবের রং ছড়ানোর পাশাপাশি পান্তা, ইলিশ, মুড়ি, মুড়কি, খই, বাতাসা, পিঠা, পায়েস দিয়ে আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে সারা দেশে চিত্রিত হবে বৈশাখী আমেজ। শোভাযাত্রা, নাচ, গান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পটের গান, পুঁথিপাঠ, লাঠিখেলা, পুতুল নাচ, লোকজ মেলার মধ্য দিয়ে আজ সারা দেশে উদযাপিত হবে পহেলা বৈশাখ।
এদিকে বাংলা নববর্ষ ১৪৩১-কে স্বাগত জানিয়ে দেশবাসীসহ বিশ্বের সব বাংলাভাষী মানুষকে নববর্ষের শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈশাখে মেলে ঐক্যের বন্ধন; এ উৎসব সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত- রাষ্ট্রপতি : এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ সবার জন্য হয়ে ওঠে আনন্দ ও মিলনের দিন। আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের ধারক ও বাহক হিসেবে এ উৎসবের গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশাখের আগমনে আমাদের জীবনে জাগে নতুন প্রত্যাশা, নব প্রতিশ্রুতি ও অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন।’ অতীতের গ্লানি, বেদনা ও ব্যর্থতা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন পথচলা শুরু হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেশকিছু জনকল্যাণমুখী ও দূরদর্শী কর্মসূচি চালু করেছে। কৃষিনির্ভর এ দেশের প্রেক্ষাপটে মুঘল আমলে ফসলি সনের প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা সনের যে যাত্রা শুরু, সেই ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখে কৃষক কার্ড কর্মসূচির সূচনা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ উদ্যোগ কৃষি খাতের উন্নয়ন এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
পহেলা বৈশাখ আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক : প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরোনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আমাদের এ অঞ্চলের কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সম্পর্ক নিবিড়। তথ্যপ্রযুক্তির এই সুবর্ণ সময়েও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কৃষক তাঁর ফসল উৎপাদনের দিনক্ষণ ঠিক করে। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা পহেলা বৈশাখের মাধ্যমে নতুন করে উজ্জীবিত হয়।’
তিনি বলেন, বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, হালখাতার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন আমাদের সংস্কৃতির বহুমাত্রিক সৌন্দর্যকে তুলে ধরে এবং আমাদের ঐক্যবোধে উজ্জীবিত করে। বাংলা নববর্ষ আমাদের সামনে এনেছে নতুন প্রত্যাশা ও নতুন সম্ভাবনা। প্রকৃতির নবজাগরণ আর মানুষের অন্তরের আশাবাদ মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক প্রাণবন্ত উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শোষণ-শাসনের অবসানের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যাত্রা শুরু করে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার। দায়িত্ব নিয়েই এই সরকার রাষ্ট্র এবং সমাজের সব শ্রেণি পেশার মানুষের জীবন মানোন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
চারুকলা অনুষদ : বরাবরের মতো এবারও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বৈশাখ উদযাপন করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর গেট (উত্তর গেট) দিয়ে বের হয়ে শাহবাগ থানার সামনে দিয়ে ইউটার্ন নিয়ে রাজু ভাস্কর্য পার হয়ে টিএসসিকে পাশে রেখে দোয়েল চত্বর প্রদক্ষিণ করে বাংলা একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হবে এই শোভাযাত্রাটি। লোকজ বিভিন্ন মোটিফ নিয়ে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি শোভাযাত্রায় থাকবে নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার। এর আগে গতকাল সোমবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত নাচ, গানসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপন করে পুরোনো বছরকে বিদায় জানায় চারুকলা অনুষদ।
ছায়ানট : বরাবরের মতো এবারও রমনার বটমূলে বৈশাখ বরণ করতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম প্রভাতে আজ ভোর সোয়া ৬টায় রমনার বটমূলে শুরু হবে ছায়ানটের বৈশাখী আয়োজন। ৮টি সম্মেলক গান, ১৪টি একক গান এবং দুটি আবৃত্তি দিয়ে সাজানো থাকবে এবারের আসর। প্রায় দুইশ শিল্পীর অংশগ্রহণে এই আয়োজন রূপ নেবে সংস্কৃতির মহাসমুদ্রে। রমনা বটমূলের দুই ঘণ্টার এই আয়োজন একযোগে সম্প্রচার করবে বিটিভি।
শিল্পকলা একাডেমি : বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ উদযাপনে পাঁচ দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। ঢাক ঢোল, লাঠিখেলা, ঘুড়ি উড়ানো, লাটিম খেলা, জারিগান, সারিগান, পটগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা, কবিগান, গাজির গান, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া গান, পুতুলনাট্য পরিবেশনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বৈশাখী মেলা দিয়ে সাজানো থাকবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমির এই আয়োজন। চৈত্র সংক্রান্তি উদযাপনের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার শুরু হয় পাঁচ দিনের এই অনুষ্ঠানমালা। আয়োজনের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। ১৭ এপ্রিল শেষ হবে শিল্পকলা একাডেমির পাঁচ দিনের এই বৈশাখী আয়োজন।
বাংলা একাডেমি : আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বইয়ের আড়ংয়ের মধ্য দিয়ে নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন করবে বাংলা একাডেমি। সকাল ৮টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে শুরু হবে এই আয়োজন। এতে নববর্ষ বক্তৃতা প্রদান করবেন ড. ওয়াকিল আহমদ। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচ ও গান পরিবেশন করবে দেশবরেণ্য শিল্পীরা। আয়োজনের অংশ হিসেবে আরও থাকছে বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) যৌথ উদ্যোগে একাডেমি প্রাঙ্গণে সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা। অন্যদিকে, বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে বইয়ের আড়ং নামের সাত দিনের বইমেলার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সকাল ৯টায় জাদুঘর মিলনায়তনের এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে নৃত্যরাগ একাডেমি, এসওএস শিশুপল্লী, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বধ্যভূমির সন্তানদল এবং বাউল দেলওয়ার বাউল ও তার দল।
উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী : ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ প্রতিপাদ্যে এবার পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করবে বর্ষবরণ পর্ষদ। এর পাশাপাশি সকাল ৯টায় রাজধানীর ধানমন্ডি-২৭ নম্বর সড়কে দিনব্যাপী উন্মুক্ত আয়োজন শুরু হবে। সেখানে শোভাযাত্রা ছাড়াও থাকবে গান, আবৃত্তি, নৃত্য, মূকাভিনয়সহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন।
চ্যানেল আই : এবারও হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ করবে চ্যানেল আই। এবারের আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বুলবুল ইসলাম, চন্দনা মজুমদার, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, প্রিয়াঙ্কা গোপ, স্বাতী সরকার। আবৃত্তি করবেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় ও ডালিয়া। নৃত্য পরিবেশন করবেন ওয়ার্দা রিহাব।
এ ছাড়াও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি), চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন বর্ণাঢ্য আয়োজনে মুক্ত পরিবেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করবে।

