ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সরকারের ২ মাস, প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মহাসড়কে সরকার

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
ছবি- রূপালী বাংলাদেশ

নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দুই মাস পার করল বিএনপি সরকার। এমন এক সময়ে তারা শপথ নিয়েছে, যখন চারদিকে শুধু সংকট আর সমস্যা। শপথ নেওয়ার এক দিন পরই শুরু হয়ে যায় পবিত্র রমজান। রমজান শেষ না হতেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে। ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ ৪১ জনই নতুন। সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক চাপ সামলাতে বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছে বিএনপি সরকার। যুদ্ধের প্রভাবে যখন সারা বিশ্বে পুরোনো রাষ্ট্রপ্রধানেরা দেশে দেশে তেলের দাম বাড়িয়েছেন, সে সময় দেশে একেবারে নতুন সরকার ১ টাকাও বাড়তে দেয়নি তেলের দাম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে গাড়ির ভাড়া বেড়ে যাবে। আর তাতে সবকিছুর দামও বৃদ্ধি পাবে। মানুষকে স্বস্তি দিতেই কষ্ট হলেও সরকার বাড়তি দাম নিজেই বহন করেছে। জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন সরকারকে ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।

স্বাভাবিক নিয়মেই সরকারে চলছে ‘হানিমুন পিরিয়ড’। এই সময়ে অতীতের সরকারগুলো শুভেচ্ছা বিনিময়, ফুল দেওয়া-নেওয়া এবং বিদেশ ভ্রমণে সময় কাটালেও বিপ্লব-পরবর্তী সরকার পরিচালনায় প্রথম ধাপে ১৮০ দিনের কর্মসূচির প্রথম ৬০ দিনেই কাজের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারও অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী। শুক্রবার দুই বেলা সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের সংসদ সদস্যরা। যুক্তিতর্ক এবং বিল পাস সমানতালে চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে বিরোধী দল আন্দোলনের সুযোগ পাবে না।

আঙুলের ভোটের কালি শুকানোর আগেই একের পর এক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে সরকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে টেকসই উন্নয়ন কতটা হবে, তা দেখতে আরও সময় লাগবে।

সরকার যখন তেলের দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অনড়, তখন একটি পক্ষ তেল মজুত করার প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ে। মজুত ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তৎপর। গ্রেপ্তার এবং জেল-জরিমানা করলেও অসাধু চক্রের কার্যক্রম থামছে না। কখনো বিএনপি, কখনো জামায়াতের নেতাদের নাম মজুতদারির তালিকায় উঠে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে সরকার কি সাফল্যের ধারায় এগিয়ে যাবে, নাকি একটি পক্ষ তাকে ব্যর্থ করতে তৎপর? এই প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

নতুন সরকার দলের সিনিয়র ত্যাগী নেতাদের মন্ত্রিত্ব না দিয়ে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করেছে, তেমনি জেলা পর্যায়ের নেতাদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ নিয়ে দলে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবীব উন নবী সোহেল, শামসুজ্জামান দুদু, আসাদুজ্জামান রিপনসহ অনেক পরিচিত নেতাকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেওয়াকে ভালোভাবে দেখছেন না অনেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক নেতা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বিদেশে অবস্থানকারী নেতা বা অ্যাক্টিভিস্টদের কদর দলে বেড়েছে বলেও তাদের ধারণা। জেলা থেকে আসা নেতারা নিজেদের এলাকায় কাজ দিচ্ছেন এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ঢাকার সঙ্গে তাদের দূরত্ব অনেক হলেও তা কমানোর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ক্রোড়পত্র মন্ত্রীর নিজ এলাকার পত্রিকায় বিতরণ নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। ক্ষুব্ধ নেতাদের দাবি, সামনে দল সংকটে পড়লে মৌসুমি নেতারা বিদেশে চলে যাবেন। তখন বঞ্চিত নেতাদেরও পাশে পাবে না দল।

প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে ড. মাহদী আমিন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। ৪ হাজার ৯০৮টি মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, ৯৯০টি মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪টি বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং ৩৯৬টি গির্জার যাজক ও পালকদের মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্বাচনি এলাকার অসহায় ও গরিবদের জন্য শাড়ি, থ্রিপিস ও হাজি রুমাল বিতরণ করা হয়েছে। সব পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জন্য ঈদ উপহার পাঠানো হয়েছে। দরিদ্রদের কাছে সম্পদ পৌঁছানো এবং কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহায়তার জন্য আলেম-মাশায়েখদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত-ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করা হয়েছে এবং ২২ হাজার কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। খাল খনন কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৪ জেলায় কাজ শুরু হয়েছে। এতে সেচব্যবস্থা উন্নত হবে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং কর্মসংস্থান বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী শনিবারও অফিস করছেন এবং কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস করা হয়েছে, বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা হয়েছে এবং এমপিদের বিশেষ সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। বাজার মনিটরিং ও জ্বালানি স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করা, শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিশ্চিত করা এবং রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করার কাজ চলছে। স্বল্প ব্যবহৃত ইকোনমিক জোন, ইপিজেড, বিসিক এলাকা, হাই-টেক পার্ক ও ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস্টার পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্কুলে পুনঃভর্তি ফি এবং ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সহায়তায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্রীড়া উন্নয়ন ও ‘নতুন কুঁড়ি’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। ই-হেলথ কার্ড, ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফুটপাতে পথচারীদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে অবৈধ দোকান উচ্ছেদ এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দর ও চলন্ত ট্রেনে ফ্রি ইন্টারনেট চালু করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন ব্যাপারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দুই মাস কোনো সরকারকে মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। তবে সামগ্রিকভাবে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতোমধ্যে প্রশংসা পেয়েছে। এই সরকার অতীতের ধীরগতির শাসনব্যবস্থা থেকে বের হয়ে সক্রিয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে উন্নয়নের গতি বাড়ানো এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হবে মূল পরীক্ষা। তিনি মনে করেন, প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই সরকার কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে। বাজার মনিটরিং জোরদার করা, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা এবং ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত করা এই তিনটি সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ যখন বাজারে গিয়ে দেখে দাম স্থিতিশীল, তখন সরকারের প্রতি আস্থা বাড়ে এটাই অর্থনীতির মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, দুই মাসে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কাজ করেছে সরকার। ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অনেক অগ্রগতি হয়েছে, যা সন্তোষজনক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করি। বাকিটা বিচার করবে দেশের মানুষ। আমার মতে, মানুষ সরকারের কাজে সন্তুষ্ট। এখন পর্যন্ত সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যা মানুষের কষ্টের কারণ হতে পারে।’