ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

সরকারের ২ মাস

প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মহাসড়কে সরকার

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ০৪:৩১ এএম

নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দুই মাস পার করল বিএনপি সরকার। এমন এক সময়ে তারা শপথ নিয়েছে, যখন চারদিকে শুধু সংকট আর সমস্যা। শপথ নেওয়ার এক দিন পরই শুরু হয়ে যায় পবিত্র রমজান। রমজান শেষ না হতেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব পড়ে দেশের জ¦ালানি তেলের বাজারে। ৫০ জনের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ ৪১ জনই নতুন। সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকার পরও বৈশ্বিক চাপ সামলাতে বেশ মুনশিয়ানা দেখিয়েছে বিএনপি সরকার। যুদ্ধের প্রভাবে যখন সারা দুনিয়ায় পুরোনো রাষ্ট্রপ্রধানেরা দেশে দেশে বাড়িয়েছেন তেলের দাম, সে সময় দেশে একেবারে নতুন সরকার ১ টাকাও বাড়তে দেয়নি তেলের দাম। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ালে বেড়ে যাবে গাড়ির ভাড়া। আর তাতে করে সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। মানুষকে স্বস্তি দিতেই কষ্ট হলেও সরকার হজম করেছে বাড়তি দাম। জ¦ালানি বিভাগের হিসাবমতে, জ¦ালানি ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ১৬৭ কোটি টাকা।

স্বাভাবিক নিয়মেই সরকারে চলছে হানিমুন পিরিয়ড। এই সময়ে অতীতের সরকারগুলো শুভেচ্ছা বিনিময়, ফুল দেওয়া-নেওয়া আর বিদেশভ্রমণে সময় কাটালেও বিপ্লব-পরবর্তী সরকার পরিচালনায় প্রথম ধাপে ১৮০ দিনের কর্মসূচির প্রথম ৬০ দিনে কাজ করেই কুলিয়ে উঠতে পারছে না। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী। শুক্রবার দুই বেলা সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের সংসদ সদস্যরা। যুক্তিতর্ক আর বিল পাস চলছে সমানতালে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে বিরোধী দল আন্দোলনের সুযোগই পাবে না। আঙুলে ভোটের কালি মুছে যাওয়ার আগেই একের পর এক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে সরকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন কতটা হবে, তা দেখতে আরও সময় লাগবে।

সরকার যখন তেলের দাম না বাড়াতে অনড়, তখন একটি পক্ষ তেল মজুত করার নেশায় মেতে ওঠে। মজুত ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যারা মরিয়া। গ্রেপ্তার, জেল-জরিমানা করলেও থেমে নেই অসাধু চক্রের কার্যক্রম। কখনো বিএনপি, কখনো জামায়াতের নেতাদের নাম উঠে আসছে মজুতদারির তালিকায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্নÑ সামনে সাফল্যের ভেলায় চড়ে এগিয়ে যাবে সরকার, নাকি তাকে ব্যর্থ করতে মুখিয়ে আছে একটি পক্ষ? এমন প্রশ্নও আছে জনমনে। নতুন সরকার দলের সিনিয়র ত্যাগী নেতাদের মন্ত্রিত্ব না দিয়ে যেমন চমকে দিয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনে, তেমনি জেলা পর্যায়ের নেতাদের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তা নিয়ে দলে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ^র চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবীব উন নবী সোহেল, শামসুজ্জামান দুদু, আসাদুজ্জামান রিপনসহ অনেক পরিচিত নেতাদের পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন জেলা থেকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেওয়াকে ভালোভাবে দেখছেন না অনেকেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একধিক নেতা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করছে না সরকার। বিদেশে ছিলেন এমন নেতা কিংবা অ্যাক্টিভিস্টদের কদর দলে বেড়েছে বলেই মনে করেন তারা। জেলার নেতাদের মন্ত্রী দেওয়ায় তারা এলাকার লোকদের দিচ্ছেন কাজ। মিশছেন এলাকার সংবাদিকদের সঙ্গে। ঢাকার সঙ্গে তাদের দূরত্ব অনেক হলেও তা ঘোচানোর চেষ্টা নেই তাদের। সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ক্রোড়পত্র মন্ত্রীর এলাকার পত্র-পত্রিকায় বিতরণের সমালোচনা উঠেছে। ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাদের দাবি, সামনে দল বিপদে পড়লে মৌসুমি নেতারা চলে যাবেন বিদেশে। তখন দেশের বঞ্চিত নেতাদেরও দল পাশে পাবে না।

প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টাদের মধ্যে ড. মাহদী আমিন রূপালী বাংলাদেশেকে বলেন, পাইলট প্রকল্পেই ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছে সরকার। ৪ হাজার ৯০৮ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, ৯৯০ মন্দিরের পুরোহিত, ১৪৪ বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ এবং ৩৯৬ গির্জার যাজক ও পালকদের মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থা করেছেন। নির্বাচনি এলাকার অসহায় ও গরিবদের জন্য শাড়ি, থ্রিপিস ও হাজি রুমাল দিয়েছেন। সব পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জন্য ঈদ উপহার পাঠিয়েছেন। দরিদ্রদের কাছে সম্পদ পৌঁছানো ও কল্যাণমূলক কার্যক্রমে সহায়তার জন্য আলেম-মাশায়েখদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত-ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ করার পাশাপাশি ২২ হাজার কৃষকের হাতে তুলে দিয়েছেন কৃষি কার্ড। খাল খনন কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খনন করবে সরকার, ইতোমধ্যে ৫৪ জেলায় শুরু হয়েছে। এতে সেচ উন্নত হবে, জলাবদ্ধতা কমবে, কর্মসংস্থান বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রী শনিবারও অফিস করছেন। কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস। বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিতকরণ। এমপিদের বিশেষ সুবিধা বাতিল করেছে সরকার। বাজার মনিটরিং ও জ¦ালানি স্থিতিশীলতা। বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ। শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস নিশ্চিতকরণ। রুগ্্ণ ও বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু। স্বল্প ব্যবহৃত ইকোনমিক জোন, ইপিজেড, বিসিক এলাকা, হাই-টেক পার্ক ও ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস্টার পুরোদমে চালুর কাজ করছে সরকার। এ ছাড়া স্কুলে পুনঃভর্তি ফি ও ভর্তিতে লটারি বাতিল করেছে সরকার। বিদেশে উচ্চশিক্ষায় রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সহায়তায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টি। এ ছাড়া ক্রীড়া উন্নয়ন ও নতুন কুঁড়ি কর্মসূচি চালু। ই-হেলথ কার্ড, ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। ফুটপাতে পথচারীর অবাধ যাতায়াতে অবৈধ দোকান, হয়রত শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তা ছাড়া বিমানবন্দর ও চলন্ত ট্রেনে ফ্রি ইন্টারনেট চালু করেছে সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন ব্যাপারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দুই মাস কোনো সরকারকে যাচাই করার জন্য পর্যাপ্ত সময় নয়। তবে মোটা দাগে স্বস্তির খবর, সরকার যত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা প্রশংসা কুড়িয়েছে। দুই মাসের মাথায় এই সরকার অতীতের ধীরগতির শাসন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে সক্রিয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ার চেষ্টা করছে, তবে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই মূল পরীক্ষা। সরকার চাইলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে। বাজার মনিটরিং শক্তিশালী করা, খাদ্য সরবরাহ চেইন উন্নত করা এবং ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত করাÑ এই তিন সিদ্ধান্তই দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষ যখন বাজারে গিয়ে দেখে দাম স্থিতিশীল, তখন সরকারের প্রতি আস্থা বাড়েÑ এটি অর্থনীতির মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, দুই মাসে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কাজ করেছে সরকার। ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অনেক অগ্রগতি হয়েছে, যা সন্তোষজনক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটা মাইলফলক হয়ে থাকবে বলেই আমার মনে হয়। বাকিটা বিচার করবে দেশের মানুষ। আমার মনে হয়, মানুষ খুশি সরকারের কাজে। এখন পর্যন্ত সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যা মানুষের কষ্টের কারণ হতে পারে।’