ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

চাপে অস্থির সরকার

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৪, ২০২৬, ১২:৫৯ এএম
ছবি - রূপালী বাংলাদেশ

পাঁচ বছরের জন্য বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে জনগণ। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচিত হলেও মোটেও স্বস্তিতে নেই নতুন সরকার। এমন এক সময়ে শপথ নিয়েছে বিএনপি সরকার, যখন চারদিকে শুধু সংকট আর সমস্যা। শপথ নেওয়ার এক দিন পরই শুরু হয়ে যায় পবিত্র রমজান। ক্ষমতা গ্রহণের সপ্তাহ না পেরোতেই মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয় বিএনপি সরকারকে। তার ওপর বিরোধী দলের দাবি আদায়ের চাপে চ্যাপ্টা হতে গিয়েও পার পেয়েছে জাতীয় ইস্যুতে। প্রশ্ন এখন, দুই মাসে কতটা পথ হাঁটল সরকার? পাওনাদার ও তেলের চাপে চ্যাপ্টা হওয়ার পথে সরকার। কতটুকু মুন্সিয়ানা দেখাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতেÑ সেই প্রশ্ন এখন সামনে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মধুচন্দ্রিমার রেশ কাটতে না কাটতেই নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং, ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির আতঙ্ক আর ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলের চাপ সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে। সবচেয়ে বড় সংকট এখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছে না সরকার। এদিকে সরকার চাপে না পড়লে জনবান্ধব নীতি গ্রহণ করে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিরোধী দল তাদের দাবি আদায়ে সরকারকে চাপে রাখতে পারে। এটা দোষের কিছু না। তবে শুধু বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা না করে, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিলে হয়তো সরকার সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান সরকারের শুরুটা বেশ ভালো। বলা যায়, অতীতের যেকোনো সরকারের চেয়ে ইতিবাচক, ব্যতিক্রম। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের বেশকিছু প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রত্যাশা ও সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। যার মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন করে বিভিন্ন ধরনের ‘কার্ড’ চালুর উদ্যোগ দেখা গেছে। নিম্নআয়ের পরিবার, প্রবীণ নাগরিক, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সুবিধাভিত্তিক কার্ড চালুর ঘোষণা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপে পৌঁছেছে। এসব কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি, চিকিৎসা সহায়তা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। কৃষি খাতে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফ বা পুনঃতপশিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান না হলেও, নীতিগত সিদ্ধান্তটি কৃষকদের জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপের কিছু পদক্ষেপও চোখে পড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো, মনিটরিং জোরদার করা এবং আমদানি নীতিতে কিছু শিথিলতা আনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। এ ছাড়া প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত এবং কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকেই যাচ্ছে তারেক রহমান সরকার, যা দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ধারা সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিগত দিনে মানুষ যখন মুখ খুলে কথা বলতে ভয় পেত, নতুন সরকারের আমলে এমন কোনো পরিস্থিতি চোখে পড়েনি বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকারের বিরুদ্ধে কটূক্তি করে ক্রমাগত পোস্ট দিয়ে গ্রেপ্তার হলেও পরদিনই জামিন পান ভোলার জামায়াতনেত্রী। এদিকে রাজধানীর তেজগাঁও থানার বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেড় মাস বয়সি পুত্রসন্তানের মা যুব মহিলা লীগ নেত্রী শিল্পী বেগমকে কারাগারে পাঠানোর চার ঘণ্টা পর জামিন দিয়েছেন আদালত। যদিও আওয়ামী লীগ শাসনামলে শিশুসন্তান নিয়ে জেল খাটার পরও বিএনপি নেত্রীকে সমবেদনা জানানোর কেউ ছিল না। সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনে মুক্তি পেয়েছেন তিনিও।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে যখন হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি, সেই সুযোগে দাবি আদায়ে বারবার চাপ সৃষ্টি করছে বিরোধী দল জামায়াত। জ্বালানি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বলছেন, প্রতিদিন ১৬০-১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকার। দেড় মাসের বেশি ভর্তুকি দিলেও শেষ অবধি জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয় সরকার। জ্বলানি তেলের দাম বাড়ায় ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মধ্যে দূরপাল্লার গাড়িতে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ১১ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে শ্রমিক-মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান। এদিকে সংকট সমাধানকল্পে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে বিরোধী দলের প্রস্তাব বিবেচনায় নেবে সরকার। তাদের প্রস্তাবে বাস্তবতার নিরিখে কিছু থাকলে সেটা বাস্তবায়ন করা হবে।

দেশে চাপের সাথে আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে সরকারের ওপর। এই যেমন, আইএমএফ থেকে ঋণ সহায়তার পরবর্তী কিস্তি পেতে কঠোর শর্ত সামনে আসায় এক ধরনের নীতিগত ও রাজনৈতিক দোটানায় পড়েছে সরকার। ভর্তুকি প্রত্যাহার, কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত বৃদ্ধি এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর মতো শর্ত বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কতটা বাস্তবায়নযোগ্য তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভেতরে এ নিয়ে নানারকম আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি পরিবর্তনের কারণে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে মার্কিন প্রশাসনের অনুমতি চেয়েছে বিএনপি সরকার।

সরকার যখন তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে সে সময়, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় মেনে নেওয়ার দাবিতে দফায় দফায় সংসদে ওয়াক আউট করে চলেছে জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী জোট। সংসদে ওয়াক আউট করেই থেমে নেই বিরোধী দল। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন, দুদক ও গুম প্রতিরোধসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন না করায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও বিরোধী দল ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে এবং আমরা সামনের সারিতে থাকব। সংসদের উত্তাপ রাজপথে ঢেলে দিতে একাধিকবার সমাবেশও করেছেন তারা। কাল শনিবার ঢাকায় ফের সমাবেশের ডাক দিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন বেপারী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিরোধী দল সরকারকে চাপে রেখে তাদের দাবি আদায় করে নেবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে শুধু বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করা অনুচিত হবে। তবে এটাও ঠিক, সরকারকে চাপে না রাখলে দুই-তৃতীয়ংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা ক্ষমতাসীনরা বিরোধী দলের কোনো দাবি মানতে চাইবে না।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদায়) রুহুল কবির রিজভী আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন, সরকার ক্ষমতায় মাত্র দুই মাস; এখনই যদি কেউ মনে করে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, তবে তার জন্য আলাদিনের চেরাগ লাগবে। সরকারের হাতে তো সেই চেরাগ নেই। সরকার রাত-দিন কাজ করছে। বিরোধী দল মনে হয় সেসব চোখে দেখছে না। সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে মানুষের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার দেশের অর্থনীতি ফোকলা করে দিয়ে গেছে। সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। চাইলেই রাতারাতি সব পরিবর্তন করতে পারবে না কেউ। এত সংকটের মধ্যেও সরকার তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে। 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদায়) নজরুল ইসলাম খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে যেসব সংকট তৈরি হয়েছে, সরকার পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। জনগণের ভোগান্তি দূর করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া মব এবং সন্ত্রাস ঠেকাতে প্রয়োজনে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সরকার।