ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

আলোচনায় ত্যাগী যোগ্য ও তরুণরা নেতৃত্বে বড় রদবদলের সংকেত

তৃণমূল পুনর্গঠনে নামছে বিএনপি

রুবেল রহমান
প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৫:৫২ এএম

সরকার গঠনের পর বেড়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ততা। রাজপথে আন্দোলন নয়, নানা সংকটের মধ্য দিয়ে সরকার পরিচালনার নানা চ্যালেঞ্জ এখন তাদের সামনে। এতে দলের কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে বিএনপিতে শুরু হয়েছে বড় ধরনের পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দলীয় গঠনতন্ত্রের বাধ্যবাধকতা মেনে মেয়াদোত্তীর্ণ ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। সে লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এরই মধ্যে সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। বিশেষ করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এবারের পুনর্গঠনে ‘ত্যাগী, যোগ্য ও তরুণ’ সামনে নিয়ে আসাকে মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ও সাংগঠনিক সংকট :

বিএনপি সূত্র মতে, দলটির অধিকাংশ সহযোগী সংগঠনের বর্তমান কমিটিগুলোর মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন নতুন কমিটি না হওয়ায় তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড বা ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে। এতে নতুন কর্মী তৈরিতে যেমন ভাটা পড়েছে, তেমনি পদপ্রত্যাশী যোগ্য নেতাদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে।

ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ আমলে স্বাভাবিক পরিস্থিতি না থাকায় কমিটি করা সম্ভব হয়নি। এদিকে আওয়ামী সরকার পতনের দুই বছর হতে চললেও নতুন কমিটি গঠনে খুব একটা আগ্রহী নন বর্তমান কমিটির নেতারা। এ ছাড়া বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের একটি বড় অংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় তাদের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রম সামাল দেওয়ার পাশাপাশি বিশাল এই দুটি সংগঠনের সাংগঠনিক কর্মকা-ে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় বিএনপির হাইকমান্ড মনে করছে, সংগঠনে গতি ফেরাতে পূর্ণকালীন সাংগঠনিক সময় দিতে পারবেনÑ এমন নেতাদের হাতেই দায়িত্ব তুলে দেওয়া প্রয়োজন। সংসদ ও সংগঠন চালানোর মতো সময় কারো হাতেই নেই।

পরিবর্তনের হাওয়া যুবদলে :

২০২৪ সালে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের যে আংশিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল, প্রায় ২২ মাস পেরিয়ে গেলেও তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় সংগঠন পরিচালনায় এক ধরনের শ্লথগতি লক্ষ করা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

সম্প্রতি যুবদলের ১৫১ সদস্যের কমিটির তালিকা জমা দেওয়া হলেও তা নিয়ে দলের ভেতরে নানা সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে একে ‘মাইম্যান কমিটি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে যুবদলের শীর্ষ দুই পদে পরিবর্তনের গুঞ্জন এখন তুঙ্গে। আলোচনায় রয়েছেন যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান, সাবেক প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, রুহুল আমিন আকিল এবং মাহবুবুল হাসান পিংকু। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল ও সাইফ মাহমুদ জুয়েলের নামও জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।

স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলে সম্ভাব্য মুখ :

স্বেচ্ছাসেবক দলের পুনর্গঠন নিয়েও তোড়জোড় কম নয়। বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবীন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান নতুন নেতৃত্বে আসার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। এ ছাড়া ঢাকা মহানগরী উত্তরের শেখ ফরিদ হোসেন এবং দক্ষিণের জহির উদ্দিন তুহিনের নামও আলোচনায় রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি সারা দেশ ৩০টি কমিটি তৈরি থাকার খবর পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণে সে তালিকা প্রকাশ হচ্ছে না। অন্যদিকে, ছাত্রদলকে একটি লড়াকু বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে এবার বিশেষ নজর দিচ্ছে হাইকমান্ড। শীর্ষ দুই পদের জন্য শ্যামল মালুম, আমান উল্লাহ আমান, খোরশেদ আলম সোহেল, সালেহ মো. আদনান এবং এইচ এম আবু জাফরের মতো তরুণদের তালিকা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। দলের তৃণমূল কর্মীদের বড় একটি অংশের দাবি, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে যুবদল বা স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পদে পদায়ন করা হোক। কারণ ছাত্রদলের পদ হারানোর পর তাকে এখন পর্যন্ত অন্য কোনো পদে দেখা যায়নি।

আলোচনা ও লবিংয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে নয়াপল্টন :

পুনর্গঠনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় পদপ্রত্যাশীদের ভিড়ে সরগরম হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের জীবন-বৃত্তান্ত প্রস্তুত করে নীতিনির্ধারকদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কে কতবার কারাবরণ করেছেন, রাজপথের মিছিলে কার কতটুকু ভূমিকা ছিলÑ সেসব খতিয়ান এখন লবিংয়ের প্রধান হাতিয়ার। ঈদুল আজহার আগেই অথবা ঈদের পরপর প্রধান এই অঙ্গসংগঠনগুলোর নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। বিএনপির অন্যান্য সহযোগী সংগঠন, যেমনÑ মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল এবং ওলামা দল, নিয়েও কাজ চলছে।

বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘পালস অফ পলিটিকস’ বা ‘রাজনীতির স্পন্দন’, সহজ কথায় সরকারি দল কীভাবে রাজনীতি করতে চায়, তা বোঝানো হয়েছে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে আয়োজিত আলোচনা। তিনি বলেন, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সব সময় অতিউৎসাহী কিছু লোক থাকে, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধী দলে থাকতে যা করা যেত, সরকারি দলে তা করা যাবে না। সরকার ও দল যাতে একাকার না হয়ে যায়, সেই বিষয়ে মতামত-পরামর্শ উঠে এসেছে আলোচনায়।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় সরকারের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চলছে। এসব মোকাবেলায় কৌশল ঠিক করা হবে। বিভিন্ন ইস্যুতে মন্ত্রীরা সরকারের পদক্ষেপ-পরিকল্পনার কথা তুলে ধরবেন। জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দলে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। অঙ্গীকার অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রকৃত সত্য ঘটনা জনগণের কাছে তুলে ধরতে হবে। নির্বাচনের কারণে গত ডিসেম্বর থেকে তারা মূলত নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত ছিলেন এবং সাংগঠনিক কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। এখন নতুন করে দল গোছানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সক্রিয় তদারকিতে প্রধানমন্ত্রী :

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, দলীয় অঙ্গসংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমাদের নেতা তারেক রহমান নিজে দায়িত্বশীলদের নিয়ে এ বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমরা একটি শক্তিশালী কাঠামো দেখতে পাব।

শুধু ছাত্রদল-যুবদল নয়, কাউন্সিল নিয়েও ভাবছে বিএনপি। ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে সরকার। ফলে রাষ্ট্রের প্রতিটি কাঠামো সংস্কারের কাজ চলছে। এরপরও দলকে গতিশীল রাখতে বদ্ধপরিকর বিএনপি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন যে, এবার কোনো ‘পকেট কমিটি’ নয়, বরং যারা রাজপথে লড়াই-সংগ্রামে পরীক্ষিত, তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হবে।